মুহ. মিজানুর রহমান বাদল,মানিকগঞ্জ:
আজ পহেলা ফাগুন বিশ্ব ভালবাসা দিবসে এ উপলক্ষে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের ফুলচাষীরা ৫ কোটি টাকা বিক্রয়ের আশাবাদী। রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা ইতিমধ্যেই ফুলের জন্য বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশী হওয়ায় বাণিজ্যিক ভাবে এখানে ফুল চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।এ উপজেলার পৌরসভাসহ ১১ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দু’শতাধিক বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় চলতি মৌসুমে ফুলের উৎপাদনও হয়েছে ভালো। এ বছর সিংগাইরের চাষিরা প্রায় কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে জানান । তারা দুটি দিবস যেমন বিশ্ব ভালবাসা দিবস ও ২১ শে ফেব্রেয়ারীকে লক্ষ্য করে এ উপজেলার ২০ জন চাষী ফুলের চাষ করে থাকেন। এ বছরের শুরুতে প্রায় ২ কোটি টাকার ফুল বিক্রয় হবে বলে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।
জানাগেছে, উপজেলার ২০ জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ১১ টি ইউনিয়নের সফল চাষীরা প্রতিবছরের মত এবারও চাষ করেছেন। ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর, জয়মন্টপের ভাকুম, শায়েস্তা ইউনিয়নের উত্তর কানাইনগর, তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা, নতুন ইরতা এলাকায় বাণিজ্যিক ভাবে ফুল চাষ করে থাকেন। যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে ফুলের যেমন কদর বেড়েছে তেমনি এলাকার কৃষক শ্রেনীর লোকজন ফুল চাষে ঝুকে পড়েছেন। এর মধ্যে স্বাবলম্বী ও হয়েছেন অনেকে। উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়নে উত্তর কানাইনগর গ্রামের টিটু মিয়ার বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে গ্রীণহাউজ শেডে জারবেরা ফুলসহ বিভিন্ন জাতের ফুল। ওই বাগানে শোভা পাচ্ছে একই প্রজাতির ৭ রঙের ফুল।
বাগানের ম্যানেজার বলেন, আমরা পাঁচ বিঘা জমি নিয়ে বছরখানেক আগে ভারত থেকে প্রতিটি ৮০ টাকা দরে একই জাতের ২২ হাজার ফুলের চারা ক্রয় করে এনে লাগিয়েছি। আমাদের এ প্রজেক্টে ৪২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। চারা রোপনের ৩ মাস পর থেকেই ফুল আসা শুরু হযেছে। সাত মাস যাবত দু’দিন পর পর গড়ে ৫ হাজারের অধিক ফুল সংগ্রহ করছি। তিনি আরো বলেন, ঢাকাস্থ আগারগাঁও ফুলের মার্কেটে প্রতিটি ৮-১০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করে থাকি। বিশেষ দিবস ছাড়াও আগামী আরো ৫ মাস পর্যন্ত এভাবেই ফুল তোলা যাবে। সব মিলিয়ে এ বছর প্রায় অর্ধকোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি। এ প্রজেক্ট আগামী দু’বছর পর্যন্ত থাকবে। আগামীতে খরচ অনেক কম হবে বিধায় লাভের পরিমান বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া ভারত থেকে আমাদের আর চারা আমদানি করতে হবে না। পাশেই সাদেকুর রহমান ও আব্দুল করিম ও ফুল চাষ করে পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো আছেন বলে জানান তারা। এদিকে স্থানীয় এক ফুল চাষী নামপ্রকাশ না করে জানান, কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি ও পরিচর্যা খরচের তুলনায় আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় আমরা লাভবান হতে পারছি না। এ বছর ভালবাসা দিবস ও মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব শবে-বরাত একই দিন শুক্রবার হওয়ার কারনে ফুলের চাহিদা ফুল বিক্রি কম হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
সরেজমিনে উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়নের উত্তর কানাইনগর গ্রামের ফুল চাষি আব্দুল করিমের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, প্রথমে দেড় বিঘা অন্যেরজমি বন্ধক নিয়ে ফুল চাষ শুরু করি। এতে কিছুটা লাভবান হই। বর্তমানে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে বিদেশী উন্নত জাতের ইস্টার,চন্দ্র মল্লিকা, কেনোলভোলা, জিপসি (বাংলা), পমপম, বেগুনি চন্দ্র মল্লিকা,হলুদ চন্দ্র মল্লিকা ফুল চাষ করছি। এতে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ৫-৬ লাখ টাকা লাভ হয়। একই এলাকার সাদেকুর রহমান সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে দেশী গোলাপ ও চায়না গোলাপ চাষ করে বছরে আয় করছেন প্রায় ৬ লাখ টাকা । তাদের আয় দেখে অনেকে উদ্যোক্তা হয়ে ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সিংগাইর উপজেলার বিভিন্ন ফুলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি দেশি গোলাপের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, জারবেরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গাডিওলাস ২৫-৩০ টাকা ও রজনীগন্ধা ১০-১৫ টাকা, জুঁই-বেলী মালা ৫০ টাকা, গাঁদা ফুলের মালা ৭০-৮০ টাকা, লিলি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, থাই-চায়না ও ইন্ডিয়ান গোলাপ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, অর্কিড ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বিক্রি হয়। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের বিশেষ দিনকে টার্গেট করে ফুলের বাজার ধরতে এ অঞ্চলের ফুলচাষিরা ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। প্রতিদিনের মত ফুল বাগানে পরিচর্যায় ব্যস্ত রয়েছেন চাষিরা। কেউ জমিতে পানি দিচ্ছেন। কেউ ওষুধ ছেটাচ্ছেন। কেউবা আগাছা পরিষ্কার করছেন। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকেই চাষিরা ফুল কেটে বাজারে নিয়ে যাছেন। এসব ফুল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানায়ায়, উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টোর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। এ এলাকার মাটি ও আবহাওয়া ফুল চাষের উপযোগী। হরেক রংয়ের গোলাপ,জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, স্টার, জিপসি,রজনীগন্ধা,গাধা ফুলের চাষ হয়ে থাকে। অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকেরা ফুল চাষে ঝুকছেন। কৃষকরা আরো জানান উপজেলা কৃষি অফিসের কোন সহয়তা পায়নি।তাদের বাগানে কোন দিন কোন ব্লক সুপারভাইজারের দেখা মিলেনি।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার মো.হাবিবুল বাশার চৌধুরী জানান,কৃষি অফিস থেকে আমরা নিয়মিত সার, রোগ ও পোকা মাকড় দমন ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ প্রদান করে থাকি।