ববি প্রতিনিধি:
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানসহ ছাত্রদল কর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আবাসিক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ও মেরে ফেলার হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরসহ তিন কর্তা ব্যক্তির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে অভিযুক্ত ছাত্রদল সভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সকলের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়াও তারা তাদের জীবনের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ পত্র উল্লেখ করা হয়েছে, ছাত্রদল কর্মীরা দুই শিক্ষার্থীকে হত্যার হুমকি, মানসিক হেনস্তা, অর্ধনগ্ন অবস্থায় জোরপূর্বক হল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া, বাঁচার শর্তে পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা, অসংলগ্ন প্রশ্ন করা, ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নেতৃত্বকে তাচ্ছিল্য করা, ছাত্রলীগ ট্যাগ দেওয়া ও অশ্রাব্যভাষায় গালিগালাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের এসব নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ পত্র দুটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উভয় শিক্ষার্থীকে গত ১৩ ডিসেম্বর রাতের প্রথম প্রহরে রাত ১:০০ থেকে ২:৩০ এর মধ্য ঘটেছে। এসময় ছাত্রদলের কর্মী রবিন মিয়া, সোহানুর রহমান সিফাত, আহসান উল্লাহসহ আরও কয়েকজন জোরপূর্বক শেরে বাংলা হলের নিচে ডেকে নিয়ে আসে। হলের নিচে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান। তাদের উপস্থিতিতেই হলের নিচে ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থী এস. এম ওয়াহিদুর রহমান ও ফয়সাল বাদশাকে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দেয়া হয়।
আরেক অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী আহসান উল্লাহ্ বলেন, “আমি ওয়াহিদকে হল থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছি হলে কে কে থাকে। আমার নামে যে অভিযোগ করা হয়েছে এমন কিছুই ঘটেনি শুক্রবার রাতে।”
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী এস. এম. ওয়াহিদুর রহমানের অভিযোগ পত্রে লিখেছেন, তাকে হলের মূল ফটকের সামনে নিয়ে ছাত্রদলের নবনির্বাচিত সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, আহসান উল্লাহ্, আকিবুর রহমান, সোহানুর রহমান সিফাত, রবিন মিয়াসহ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা নেতাকর্মী ঘিরে ধরেন। তার দেহ তল্লাশি করা হয় এবং হলে বৈধভাবে থাকার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।তাকে ‘ছাত্রলীগ ট্যাগ’ দিয়ে আওয়ামী লীগের আমলে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে হলে থাকার অভিযোগ আনা হয়।পূর্বের একটি ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে রবিন মিয়া তাকে হত্যার হুমকি দেন এবং ভবিষ্যতে “বাঁচতে দেওয়া হবে না” বলে ভয় দেখান।এ সময় তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং সংঘবদ্ধভাবে মানসিকভাবে হেয় করা হয়।
আরেক ভুক্তভোগী ফয়সাল বাদশা অভিযোগ পত্রে লিখেছেন, রাত ১টার দিকে তাকে রুমের সামনে থেকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে লুঙ্গি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরার সুযোগ দেওয়া হয়নি। খালি গায়েই শীতের মধ্যে টেনে-হিঁচড়ে হলের নিচে নেওয়া হয়।তাকে প্রায় এক ঘণ্টা যাবত বেঞ্চ ও গেস্টরুমে বসিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়।’’অবৈধ শিক্ষার্থী’ এবং ‘শিবির সংশ্লিষ্টতার’ অভিযোগ তুলে তাকে জোরপূর্বক ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয় যে, তার খালি গায়ের ভিডিও ধারণ করে পা ধরে ক্ষমা চাওয়ানো হয়।
দুই শিক্ষার্থীই অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, চারুকলা সংসদ আয়োজিত ‘মাঘমল্লার’ অনুষ্ঠানে গভীর রাত পর্যন্ত শব্দদূষণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের ক্ষোভের দায় তাদের ওপর চাপানো হয়। তাদের হুমকি দেওয়া হয় যে ভবিষ্যতে ছাত্রদলের নির্দেশ না মানলে “চরম পরিণতি” ভোগ করতে হবে।
ভুক্তভোগীরা জানান, এই ঘটনার পর তারা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং হলে স্বাভাবিকভাবে বসবাস ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। তারা দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মী সোহানুর রহমান সিফাত বলেন, “ঐদিন এই ধরনের(অভিযোগ পত্রে উল্লেখিত) কোনো ঘটনাই ঘটেনি। যে অভিযোগ দিয়েছে আমার নামে সে তো হলের আবাসিক শিক্ষার্থীই না। বর্তমান সময়ে এরকম ঘটনা ঘটার সম্ভবনাই নেই।”
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন,”আমরা সেদিন মুক্তমঞ্চের ঘটনা সম্পর্কে সাধারণ আলাপ আলোচনা করছিলাম। সেখানে অভিযোগ দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তৌফিক আলম এ বিষয়ে দৈনিক জনকণ্ঠকে জানান, “অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

