১৫২৮ সাল মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি তৈরি করলেন এক বিশাল স্থাপনা—বাবরি মসজিদ। কিন্তু এই মসজিদ নির্মাণকে ঘিরে থেকেই গেল এক দীর্ঘ বিতর্ক। কারণ, বহু হিন্দুর বিশ্বাস, এই স্থানটি ছিল তাদের আরাধ্য দেবতা রামের জন্মভূমি। প্রায় পাঁচশো বছরের নীরব ইতিহাসের পর, ১৯৪৯ সালে সেই বিতর্কের আগুনে যেন প্রথম স্ফুলিঙ্গ দেখা দিল, যখন মসজিদের মূল গম্বুজের মধ্যে রামলালার মূর্তি পাওয়া গেল।
দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেল বহু দশক। হিন্দুদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হলো, শুরু হলো আইনি লড়াই। আর এই লড়াইয়ের ক্লাইম্যাক্স এলো ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর। উত্তাল হয়ে উঠল অযোধ্যা। বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলী মনোহর জোশীদের উপস্থিতিতে, হাজার হাজার করসেবকের ঢল নামল।
সেদিন বাবরি মসজিদের চূড়ায় উঠে হাতে শাবল তুলে নিয়েছিল দুই তরুণ। বলবীর সিং এবং যোগেন্দ্র পাল। তারা ছিল শিবসেনার সক্রিয় কর্মী। ধর্মীয় উন্মাদনায় তখন টগবগ করে ফুটছে তাদের রক্ত। মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে গেল শত শত বছরের পুরনো এই কাঠামো।
পানিপথে ফিরে তারা পেল বীরের সংবর্ধনা। স্থানীয়দের কাছে তারা হয়ে উঠল নায়ক। কিন্তু বাহুবলী বা নায়কত্বই কি জীবনের শেষ কথা? বলবীর সিং-এর জীবন নাটকীয়ভাবে মোড় নিল। বাড়ি ফিরতেই তার গান্ধীবাদী বাবা, দৌলত রাম, স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন: “এ বাড়িতে হয় তুমি থাকবে, না হয় আমি।” পুরনো জীবনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হলো বলবীরের। স্ত্রী পর্যন্ত তার সাথে যেতে রাজি হলেন না।
শুরু হলো এক অনিশ্চিত, একাকী জীবন। লম্বা দাড়িওয়ালা কোনো মুসলিম দেখলেই ভয় পেতেন তিনি। ভবাঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে তিনি একসময় শুনলেন, তার বাবা আর নেই। বাবরি ভাঙার দুঃখেই নাকি তার মৃত্যু হয়েছে! এই কথা শুনে ভেঙে পড়লেন বলবীর। অনুশোচনার এক তীব্র অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করল।
অন্যদিকে, বন্ধু যোগেন্দ্র পালের খোঁজ নিতে গিয়ে বলবীর জানতে পারলেন আরও এক বিস্ময়কর সত্য। মসজিদ ভাঙার অপরাধবোধে মানসিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় যোগেন্দ্র নাকি প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন!
আর দেরি করেননি বলবীর। সোনপথে গিয়ে মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর কাছে দীক্ষা নিলেন। জন্ম হলো মোহাম্মদ আমিরের। তিনি রাখলেন লম্বা দাড়ি, নিয়মিত মসজিদে যান, ঘরে ফজরের আজান দেন। আল্লাহর জিকিরে শান্তি খুঁজে পেলেন তিনি।
বলবীর সিং থেকে মোহাম্মদ আমির—এই রূপান্তর শুধু ধর্ম পরিবর্তনের গল্প নয়, এটি গভীর অনুতাপ, অপরাধবোধ এবং আত্ম-শান্তির সন্ধানের গল্প। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে মোহাম্মদ আমির এক বিশেষ প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি ভারতের ভেঙে পড়া একশোটি মসজিদ সংস্কার করবেন। তার দাবি, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মেওয়াট এলাকায়, বহু জরাজীর্ণ মসজিদ খুঁজে সেগুলোর সংস্কার করেছেন।
৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯২-এ যে দুজন একই পথে হেঁটেছিলেন, পরিণতিতে তাদের পথই দুজনকে দিয়ে গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয়। বলবীর ও যোগেন্দ্রর গল্প আমাদের শেখায়: ইতিহাসের ভুল শোধরানো যায় না, কিন্তু অনুশোচনার শক্তি মানুষকে আমূল বদলে দিতে পারে।
সম্প্রতি, এই ঘটনার আইনি পর্ব শেষ হলো। ৩২ জন অভিযুক্ত পেলেন অব্যাহতি। কিন্তু মানুষের জীবনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তার নিরাময় কি সত্যিই সম্ভব? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি ভারত বাবরি মসজিদের ইতিহাসকে পিছনে ফেলে শান্তি ও সম্প্রীতির নতুন পথে হাঁটতে পারবে? আপনারা কী মনে করেন? কমেন্ট বক্সে জানান।

