সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্র শ্রীমঙ্গলে সম্প্রতি এক পর্যটক দম্পতির রুমে অনধিকার প্রবেশ,ভিডিও ধারণ এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এটি শ্রীমঙ্গলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা,পর্যটন খাতের মান এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গত ৭ নভেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়-এক যুবক পর্যটকের রুমে ঢুকে অর্থ দাবি করছেন। ভিডিওতে তার পরিচয় স্পষ্ট না হলেও স্থানীয় সূত্র বলছে তিনিই ঘটনার মূল হোতা এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী যুক্ত ছিল।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও পর্যটন সচেতন মহল জানাচ্ছেন,হোটেল বা রিসোর্টের রুম পর্যটকের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত জায়গা। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা শুধু দেশের ফৌজদারি আইন লঙ্ঘন নয়,এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনেও বিরোধী।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR-1948), অনুচ্ছেদ ১২:
“No one shall be subjected to arbitrary interference with his privacy, family, home or correspondence.”
স্থানীয়রা ঐ ঘটনার পর বলেছেন,
“কারা অনুমতি দিয়েছে যাতে কেউ পর্যটকের রুমে ঢুকতে পারে এবং ভিডিও ধারণ করতে পারে?”
তাদের মতে,প্রশাসন যদি এই ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ না নেয়,তাহলে অন্যরাও একই অপরাধ করার সাহস পাবে।
ঘটনাটি শ্রীমঙ্গল উপজেলার মঙ্গলালয় রিসোর্টে ঘটে। রিসোর্টের কেয়ারটেকার মো. বুরহান উদ্দিন শনিবার (৮ নভেম্বর) শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে সাতজনের নাম উল্লেখসহ আরও ১৪-১৫ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন-
“ভুক্তভোগী পর্যটক এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেননি। অভিযোগ দেওয়ার পর আমরা প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু করব।”
কিন্তু স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন,ঘটনার সময় কেয়ারটেকার ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন। তাই তার অভিযোগ গ্রহণ না করার বিষয়টি সন্দেহের উদ্রেক করছে।
২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হলেও সরকারি উদ্যোগ সীমিত। প্রকাশিত কোনো গেজেট নেই এবং বাস্তব উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়।
বড়লেখায় অনুমোদিত সাফারি পার্ক প্রকল্পও থেমে আছে। চা বাগান,লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুন্ড ও হামহাম জলপ্রপাত,বর্ষীজোড়া ইকোপার্ক,হাকালুকি হাওর এবং বাইক্কাবিলসহ অর্ধশতাধিক পর্যটন স্পট এখনো নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর অভাবে ভোগান্তিতে।
প্রতিবছর হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে আসলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা,আবাসন, বিনোদন এবং তথ্যসেবা না থাকায় অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যান।
পর্যটকরা শুধু চাঁদাবাজি বা অনধিকার প্রবেশের শিকার হচ্ছেন না; এ অঞ্চলে অবৈধ ব্যাটারি রিকশা ও বেপরোয়া ট্রাফিক চালনা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালের অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে, শ্রীমঙ্গল শহরে প্রায় ৫,০০০ নিবন্ধনবিহীন ব্যাটারি রিকশা চলাচল করছে। বেপরোয়া চালনার কারণে পর্যটকসহ স্থানীয়দের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
১ অক্টোবর ২০২৫-এ একটি প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত ও দু’জন গুরুতর আহত হন। এছাড়া,শ্রীমঙ্গল- কমলগঞ্জ সড়কের দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় হরিণ,বানর এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীও নিয়মিত মারা যাচ্ছে।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের ভাষ্য:
“শ্রীমঙ্গলের পর্যটন খাত রক্ষায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যেই হোক, দলের লোক হোক বা প্রভাবশালী-আইনের বাইরে রাখা যাবে না।”
তাদের মতে,এটি শুধু চাঁদাবাজি বা অনধিকার প্রবেশের ঘটনা নয়; এটি পর্যটন নগরীর ভাবমূর্তি ও দেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,শ্রীমঙ্গলকে সত্যিকারের পর্যটন জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে-
১) নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার।
২) পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলা।
৩) পর্যটন স্পটগুলোর মান উন্নয়ন।
৪) প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
শুধুমাত্র এইভাবে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গল পর্যটকদের জন্য নিরাপদ,আকর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি ধরে রাখতে পারবে।

