রুশাইদ আহমেদ, বেরোবি :
সময়ের পরিক্রমায় প্রায় দেড় যুগে পা রাখতে চলেছে বাংলাদেশের “উত্তরের বাতিঘর” বলে খ্যাত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। উত্তরা জনপদের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বন্ধুর পথ অতিক্রম করে আসতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে।
তবে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তথা জুলাই আন্দোলনের পর থেকে কিছুটা বদলাতে শুরু করে দৃশ্যপট। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হবার পর অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বেরোবিকে “সেন্টার অব এক্সিলেন্স” হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরুর উদ্যোগ নেন।
এরপর বিগত ১৪ মাসে বেরোবি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ছাত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা, তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক মেইল প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সংকট লাঘব, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কমন রুম উদ্বোধন, স্নাতকোত্তরে থিসিস শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা অনুদান বরাদ্দের মতো বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নজরে আসে।
পাশাপাশি, সত্বর একাডেমিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টারপ্ল্যানের জন্য সরকারের কাছ হতে বাজেট বরাদ্দ আনয়ন, বিগত আমলে নানা অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ছাত্রী হল ও ড. ওয়াজেদ মিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (অধুনা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এক্সিলেন্স) নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু, প্রথমবারের মতো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচন এবং সমাবর্তন আয়োজনের মতো আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ হতে।
কিন্তু এরপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা, জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার না পাওয়া, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার অন্তঃর্কোন্দল এবং আনুষঙ্গিক আরও অনেক প্রতিবন্ধকতার কারণে বারবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি থমকে দাঁড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে প্রতিশ্রুতির এক বছর পেরিয়ে যাওয়ায় গত আগস্টের মাঝামাঝি বিশ্ববিদ্যালয় আইন তথা ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর আইন ২০০৯’-এ ব্রাকসু নির্বাচনের নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে তিনদিন আমরণ অনশনে বসতে বাধ্য হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের ভেতর বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধনীর গেজেট হাতে পাওয়া সাপেক্ষে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের আশ্বাস দেয়।
তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরিত গেজেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ব্রাকসুর নীতিমালা যুক্ত হওয়ার অনুমোদন আসে ২৭ অক্টোবর। এরপর নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা দেওয়া হলেও গত ৫ নভেম্বর ১১৬তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান পদত্যাগ করলে আরেক দফা জটিলতা দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৭তম সিন্ডিকেট সভায় পুনরায় অধ্যাপক ড. মো. শাহজামানকে নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু এরপর এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপ প্রকাশ না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীরা গত ১৮ নভেম্বর আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ ফটকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে অবিলম্বে ব্রাকসু নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ প্রকাশের জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।
সেই সূত্র ধরে ১৯ নভেম্বর ব্রাকসু নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী তফশিল ঘোষণা করে। তফশিল মোতাবেক আরও এক মাস পিছিয়ে ২৯ ডিসেম্বরকে ব্রাকসু নির্বাচনের তারিখ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ দিকে, ১৮ ডিসেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার মোতাবেক শীতকালীন ছুটি শুরুর কথা থাকায় শিক্ষার্থীরা পুনরায় ক্ষোভ প্রকাশ করলে ১৯ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৫তম একাডেমিক কাউন্সিল সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন ছুটিও এক মাস পিছিয়ে ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে পুনঃনির্ধারণ করা হয়। পরে চাপে পড়ে ২০ নভেম্বর তফশিলে সংশোধনী এনে ভোটের তারিখ হিসেবে ২৪ ডিসেম্বরকে পুনরায় নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন।
একইভাবে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন আয়োজনের কথা জানান সমাবর্তন আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম। প্রাথমিকভাবে ১৫, ২২ ও ২৯ নভেম্বরের যে কোনো দিন সমাবর্তন আয়োজনের জন্য অনুমোদন চেয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলকে চিঠি দেওয়া হয়।
পরে ব্যস্ততার কারণে অতিথিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারায় গত ৭ অক্টোবর সমাবর্তনের তারিখ পিছিয়ে ২০ ডিসেম্বর ধার্য করার কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী। সে সময়, আইন উপদেষ্টার বদলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় দিবস তথা ১২ অক্টোবর থেকে সমাবর্তনের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম উদ্বোধনের কথাও জানান তিনি।
তবে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সমন্বিত গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কারণে বিভাগীয় কেন্দ্র হিসেবে বেরোবিতে পরীক্ষা আয়োজনের কথা থাকায় গত ১৯ নভেম্বর ব্রাকসু নির্বাচনের মতো দ্বিতীয় দফায় সমাবর্তনের তারিখ পিছিয়ে ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি ঠিক করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর পরদিন ২০ নভেম্বর অবশেষে উদ্বোধন করা হয় সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের। এমতাবস্থায়, বারবার সমাবর্তন পেছানো এবং অতিথি কারা হবেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মধ্যে।
অপর দিকে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমে গতি আনয়নে একাডেমিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রায় দেড় বছরে বিষয়টি এখনও শুধু কয়েক দফার মতবিনিময় সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১১ মে ও ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষার্থী এবং বিশেষজ্ঞদের ভেতর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের লক্ষ্যে দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে নভেম্বর মাসও প্রায় শেষের পথে থাকায় মাস্টারপ্ল্যান কবে পাস হবে কিংবা তার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কবে বিশ্ববিদ্যালয় পাবে—তা নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়েছেন বহু শিক্ষার্থী।
সার্বিকভাবে জুলাই আন্দোলনের পরও বারবার এভাবে বেরোবির গতি থমকে দাঁড়ানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হক বলেন, আসলে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অব্যবস্থাপনার উপস্থিতি এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে ভুগে আসছে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। “গলদপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো”-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত উপাচার্যদের আমলে এখানে প্রশাসনে বিভিন্ন “কোরামের দৌরাত্ম্য” ছিল চোখে পড়ার মতো। ষষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে বর্তমান শওকাত আলী প্রশাসনের সামনেও একই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আলটিমেটলি কেউই সেই পুরনো ব্যবস্থা ঠিক করতে পারেননি।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু (সুবিধাবাদী) শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী গোষ্ঠী সবসময়ই এখানে নিজেদের প্রভাববলয় তৈরির চেষ্টা করেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরকেও অসাধুভাবে ব্যবহার করা হয়।
ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, অথচ ১৭ বছর ধরে এ ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্র সংসদ নেই। সার্বিক অগ্রগতির জন্য কাজ করার প্রবণতাও তাই দৃশ্যমান নয় তেমন। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন থাকলেও, তারা আলাদা আলাদা এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ বারবার রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মোজাম্মেল।
একইভাবে, বেরোবির অগ্রযাত্রার গতি বারবার শ্লথ হওয়ার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে বলে দাবি করেন একই শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী খোকন ইসলাম। তাঁর মতে, সর্বজনীন অগ্রগতির বদলে দায়িত্বশীল পর্যায়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করা কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার প্রবণতা এ ক্ষেত্রে প্রথম কারণ হিসেবে বিরাজ করছে। এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি কীভাবে হবে—সে বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতন না হওয়া কিংবা বুঝেও নীরবতা পালনের কারণে সংকট বাড়ছে বলে জানান তিনি।
খোকন বলেন, (বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের মতো) যৌক্তিক বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা (তেমন) কথা না বলায় গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে সমগ্র প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি, কখনও ছাত্র সংসদও এখানে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য (কল্যাণকর) মৌলিক দাবিগুলো আদায় করে নিতে কেউ তেমন প্রতিক্রিয়া দেখান না। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে শেকড় গাড়া “হিডেন পলিটিক্সগুলো”-ও প্রকাশ্যে আসছে না। এ কারণেই বারবার বেরোবি পিছিয়ে পড়ছে বলে দাবি করেন খোকন।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সবুর হোসেন বলেন, বেরোবির সামগ্রিক উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে “বহু বছরের প্রশাসনিক দুর্বলতা” দায়ী। তারা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই শুধু কথা দিয়ে এসেছে—কাজ করেনি। বর্তমান কর্তৃপক্ষ দুয়েকটি কাজ তা-ও করেছে। তবে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি এখনও তাঁরা পূরণ করেনি।
সমাবর্তন নিয়ে অব্যবস্থাপনার বিষয়ে সবুর বলেন, কর্তৃপক্ষ প্রথমে যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া সমাবর্তন আয়োজনের কাজ শুরু করেছিল। অতিথি কারা হবেন, ভেন্যু কী হবে—এসব বিষয় নিয়েও এখনও অস্পষ্টতা কাটেনি। মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে তিনি বলেন, এক বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাস পাচ্ছি হাজার কোটি টাকার বাজেট আসবে মাস্টারপ্ল্যানের জন্য। কিন্তু এখনও তা এলো না। ব্রাকসু নির্বাচন নিয়েও “তালবাহানা” চলছে। বারবার পেছানো হচ্ছে। এবার শীতকালীন ছুটিও পর্যন্ত এক মাস পেছানো হলো। এভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মো. মাসুদ রানা জাতীয় পর্যায়ে উত্তরাঞ্চল ও বেরোবির বঞ্চনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, রংপুর তথা উত্তরাঞ্চল স্বাধীনতা পরবর্তী সময় হতেই বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। আমার কাছে মনে হয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানে বাজেট বরাদ্দ বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ মূলত দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের এই অঞ্চলের প্রতি অবহেলার বহিঃপ্রকাশ।
তিনি আরও বলেন, ব্রাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। তবে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী চায় না ব্রাকসু নির্বাচনটা অবাধ সুষ্ঠুভাবে হোক। তাই প্রতিনিয়ত নিত্য-নতুন ইস্যু তৈরির মধ্য দিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে তাঁরা। এখানে নির্বাচনের তারিখ নিয়েও প্রশাসনের খামখেয়ালিপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। সমাবর্তন আয়োজন নিয়েও পরিকল্পনায় বারবার অদলবদল আনার বিষয়টিকে “প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি” বলে আখ্যা দেন মাসুদ।
এ দিকে, বেরোবির অগ্রযাত্রার গতি কেন বারবার থমকে দাঁড়াচ্ছে সে বিষয়ে মতামত নিতে যোগাযোগ করা হয় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সঙ্গে। তাঁরা জানান, মূলত বিশ্ববিদ্যালয়টির বিদ্যমান “ত্রুটিপূর্ণ সংস্কৃতি আর ব্যবস্থার” কারণেই সর্বজনীন উন্নয়ন সাধন ত্বরান্বিত হতে পারছে না।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা জান্নাত তোশি বলেন, বিগত সাত-আট বছর ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়নি। শ্রেণিকক্ষ আর শিক্ষক সংকটও তাই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। এই সংকটগুলো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী পক্ষের মাঝে বিরাজমান নেতিবাচক সংস্কৃতি ও সিস্টেমের সমালোচনা করে তোশি আরও বলেন, এখানে যখনই নতুন কোনো প্রশাসন আসে, তখনই বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মকর্তা গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে প্রশাসনকে “শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখার পাঁয়তারা” করেন। তাই এই দায় শুধু ভিসি কিংবা প্রশাসনের ওপর বর্তায় না। সমগ্র বিষয়টা চলে যায় “বিদ্যমান সিস্টেমের” ওপর। কারণ একজন ভিসি আসেন শুধু চার বছরের জন্য। সেই পরিপ্রেক্ষিত থেকে বেরোবির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে বিরাজমান স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহলের শৃঙ্খল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মুক্ত রাখার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন এই শিক্ষক।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রংপুরবাসীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে রংপুরের কৃতী সন্তান ও নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে নামকরণ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির।
প্রাথমিকভাবে ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে রংপুরের ধাপ এলাকায় সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি রংপুর ক্যাডেট কলেজ ও রংপুর কারমাইকেল কলেজের মধ্যবর্তী ৭৫ একর জমির উপর স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মিত হলে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মোট ২২টি বিভাগে ৭ থেকে ৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নেই কোনো মাস্টারপ্ল্যানের মতো পরিকল্পিত উন্নয়নের ভিত্তি, কিংবা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন আর সমাবর্তন আয়োজনের বালাই।
সম্প্রতি, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের আত্মত্যাগ এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে বিগত সরকারের পতনের পর নতুন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেরোবিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের দাবি হয়ে উঠেছে আরও জোরদার।

