মাত্র চার মাস সাত দিনের বিচার প্রক্রিয়া! আর সোমবার ঘোষিত হলো এক ঐতিহাসিক রায়—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বিচার হওয়া এই মামলা, এখানেই কি শেষ? নাকি, সামনে অপেক্ষা করছে আরও জটিল, আরও কঠিন এক আইনি গোলকধাঁধা? চলুন, ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আমরা জেনে নিই, এই রায়ের পর আইনের দরজা কোথায় কোথায় খোলা আছে।
মনে রাখতে হবে, এই বিচার কিন্তু পলাতক দেখিয়ে হয়েছে। এবং এখানেই আসে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বাধা।
আইন বলছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার আগে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ব্যক্তিকে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতে হবে, অথবা গ্রেফতার হতে হবে! ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরও স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইনি অধিকার পেতে হলে এই শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক।
অর্থাৎ, বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে আপিল করার আগে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটিই এই মামলার পরবর্তী অধ্যায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় মোড়।
যদি আত্মসমর্পণ করা হয়, তবেই শুরু হবে আইনি লড়াই। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর এই আপিল করার সময়সীমা? মাত্র ৩০ দিন!
আপিল বিভাগে আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি, ভুল বা ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়টি তুলে ধরে তাদের মক্কেলকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন। আপিল বিভাগ এই রায় বহাল, পরিবর্তন বা বাতিল—সবকিছুই করতে পারে।
মনে আছে ২০১৩ সালের সেই কাদের মোল্লার রায়? সেই রায়ের পরই আইন সংশোধন করা হয়, যাতে সরকার বা অভিযোগকারীরাও আপিল করতে পারে। সেই আইনি পথই এখন শেখ হাসিনার সামনেও খোলা।
যদি আপিল বিভাগেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে, তখনও একটি শেষ বিচারিক দরজা খোলা থাকবে—তা হলো ‘রিভিউ’ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন! আপিল বিভাগেই এই আবেদন করতে হয়। এই রিভিউ আবেদনই হলো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে আইনি প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ।
কিন্তু এখানেই একটি আশার আলো! জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিলেও, তিনি রিভিউ আবেদনেই খালাস পেয়েছিলেন! এটি একটি নজির, যা দণ্ডপ্রাপ্তদের শেষ আশা জাগায়। আর যদি রিভিউ আবেদনও খারিজ হয়ে যায়? তখন জীবন বাঁচানোর শেষ সুযোগটি হলো— রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা! সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দণ্ড মওকুফ বা কমাতে পারেন। এটিই বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরের চূড়ান্ত সুযোগ।
শুধুমাত্র শাস্তি নয়, ট্রাইব্যুনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নির্দেশও দিয়েছে—শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জুলাইয়ে নিহত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে।
আইন অনুযায়ী, সরকার এখন এনবিআর বা অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তা বন্টন করবে।
একদিকে মৃত্যুদণ্ড, অন্যদিকে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। পলাতক অবস্থায় এই আইনি যাত্রা কতটা দীর্ঘ হবে, তা এখনই বলা কঠিন। এটি কি কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া রায়, যেমনটি শেখ হাসিনা দাবি করেছেন? নাকি আইন নিজের পথে চলবে?
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, আপনি কী মনে করেন? পলাতক অবস্থায় এই আপিল প্রক্রিয়া কি শুরু হবে? আপনার মতামত নিচে কমেন্ট বক্সে লিখে জানান। দেশের এমন সব আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ জানতে আমাদের চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন!

