জুলাই বিপ্লবের সময় হতাহতদের বড় একটি অংশকে যে কয়টি সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল তার মধ্যে অন্যতম। হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত এখানে তিন শতাধিক আহত এবং ৪৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। তবে হাসপাতালের তৎকালীন চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন—প্রকৃত সংখ্যা এর দুই থেকে তিনগুণ বেশি।
তাদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামীপন্থি পরিচালক ডা. শফিউর রহমান সরকারের নির্দেশে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করতে রেজিস্ট্রেশন বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন এবং নতুন বই গায়েব করেন।
বিপ্লব চলাকালে আহতদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া চিকিৎসকরা জানান, ১৮ জুলাই থেকে হাসপাতালে শতাধিক হতাহত আনা হয়। অনেকে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই মারা যান, আবার অনেকেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকদের হিসাবে ১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এক শিফটেই ২০ জনের বেশি লাশ হাসপাতালে আসে।
চিকিৎসকরা বলেন, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ জনের লাশ আসত। অথচ কর্তৃপক্ষ লাশের সংখ্যা দিয়েছে তার তিনভাগের একভাগ।
একজন ট্রেইনি ডাক্তার বলেন, “১৮ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৮০ থেকে ২০০ জন ভর্তি ছিল, প্রতিদিনই মৃত্যু হতো দুই থেকে তিনজনের।”
ক্যাজুয়ালটি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, “১৯ জুলাই মোহাম্মদপুরের হত্যাযজ্ঞের পর একদিনেই ৫০টি লাশ আসে। অধিকাংশের নাম-পরিচয় রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি।”
অভিযোগ রয়েছে, পরিচালক শফিউর রহমানকে সরকার পরিবর্তনের পরও বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে পদে রাখা হয়, পরে ১০ আগস্ট তাকে ওএসডি করে সাভারের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) সংযুক্ত করা হয়।
ওসেক বিভাগে দায়িত্বে থাকা এক সিনিয়র নার্স বলেন, “হাসপাতালে আহতদের তথ্য গোপনের নির্দেশ আসে উপর থেকে। পরিচালক নিজে উপস্থিত থেকে নিবন্ধন বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেন।”
অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খান বলেন, “সরকারের চাপেই তথ্য গোপন করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া সংখ্যা সঠিক নয়।”
তবে তৎকালীন পরিচালক ডা. শফিউর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সব ডকুমেন্টস মন্ত্রণালয়ে বুঝিয়ে দিয়েছি। ভুল তথ্য দিয়ে কেউ আমাকে হেয় করতে চাইছে।”
সেবা তত্ত্বাবধায়ক শাহনেওয়াজ পারভীনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “পরিচালকের নির্দেশেই আমরা কাজ করেছি। তথ্য গোপনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেন, “শুধু সোহরাওয়ার্দী নয়, অন্যান্য হাসপাতালেও তথ্য ধ্বংসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি স্বাধীন তদন্তে যাচাই করা জরুরি।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, “এমন ঘটনা সত্য হলে এটি গুরুতর অপরাধ। কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দিলে মন্ত্রণালয় তদন্ত করবে।”

