সত্যজিৎ দাস:
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি,হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক পবিত্র ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই তিথিতেই দ্বাপরযুগে,রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্যে,অশুভ শক্তির দমন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পূর্ণ অবতার রূপে আবির্ভূত হন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। প্রায় পাঁচ সহস্রাব্দ আগে সংঘটিত সেই জন্ম মুহূর্ত আজও মানবসমাজকে আলো দেখায়।
ভবিষ্যদ্বাণী ছিল-দেবকীর অষ্টম পুত্রই মথুরার স্বৈরাচারী রাজা কংসের পতন ঘটাবে। এই আশঙ্কায় কংস একে একে দেবকীর সাত সন্তান হত্যা করে। অষ্টম সন্তান জন্মের মুহূর্তে ঘটল অলৌকিক ঘটনা: কারাগারের শিকল আলগা হয়ে গেল,দ্বার নিজে থেকে খুলে গেল,প্রহরীরা গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়ল। নবজাতক কৃষ্ণকে কোলে নিয়ে বাসুদেব ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে যমুনা পার হয়ে গোকুলে পৌঁছে দিলেন,যেখানে নন্দ-যশোদা তাঁকে লালন করবেন।
শ্রীকৃষ্ণ নিজেই গীতায় ঘোষণা করেছেন: “যখন ধর্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ও অধর্ম বিস্তার লাভ করে,তখনই তিনি অবতীর্ণ হন;সাধুকে রক্ষা,দুষ্টকে দমন ও ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। তাঁর জীবন কেবল যুদ্ধজয় নয়, বরং জ্ঞান,প্রেম ও নৈতিকতার এক অবিনশ্বর পাঠ”।
এই উৎসব ভক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা বহুমাত্রিক:-
১) অন্যায়ের উপর ন্যায়ের জয়: কংসের পতন সামাজিক মুক্তির প্রতীক।
২) গীতার শিক্ষা: ধর্ম (নৈতিক কর্তব্য),কর্ম (দায়িত্বশীলতা) ও ভক্তি (আন্তরিক ঈশ্বরপ্রেম) তাঁর শিক্ষার মূল ভিত্তি।
৩) উপবাস ও পূজা: ভক্তরা সূর্যোদয় থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপবাস করেন,কৃষ্ণ জন্মের সময় পূজা-অর্চনা ও ভজন করেন,পরে প্রসাদ বিতরণ করেন।
৪) সাংস্কৃতিক রূপ: মহারাষ্ট্রের ‘দহি হান্ডি’,ভজন-সংগীত,নাটক ও নৃত্যে কৃষ্ণের শৈশব লীলার আনন্দ ভাগ হয়।
জন্মাষ্টমী ঘরে-ঘরে মিলনের উপলক্ষ। পরিবার একত্র হয়ে পূজা,গৃহসজ্জা ও বিশেষ রান্নায় অংশ নেয়। প্রবীণরা তরুণদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখান। এই প্রজন্মান্তরীয় সেতুবন্ধ সমাজে ভক্তি ও নৈতিকতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশ-ভারত ছাড়াও বিশ্বের নানা দেশে ভারতীয় ও হিন্দু সম্প্রদায় এই দিনটি একই ভক্তি ও উৎসাহে পালন করে। মন্দিরগুলোতে সারারাত ভজন, গীতাপাঠ, কীর্তন ও নাট্যমঞ্চন চলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আচার মিলিয়ে জন্মাষ্টমী হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উভয় দিকেই সমৃদ্ধ।
জন্মাষ্টমী আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়:-
” সত্যের পথে স্থির থাকা “
” অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করা ”
” ভালোবাসা ও করুণার মাধ্যমে সমাজ গড়া “
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম কেবল অতীতের এক কিংবদন্তি নয়; এটি মানবতার জন্য ন্যায়ের সংগ্রাম,প্রেমের শক্তি ও আধ্যাত্মিক জাগরণের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। যুগে যুগে তাঁর শিক্ষা ও অবতার কাহিনি যেমন ভক্তকে দৃঢ় করে,তেমনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে আলোর যাত্রায় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকে।