গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে পাঁচ দেশের প্রভাবশালী জোট ‘ফাই-আইজ’ থেকে কানাডাকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব তুলেছেন হোয়াইট হাউজের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা।
কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোসহ ডনাল্ড ট্রাম্পের নানা ‘হুমকি-ধমকির’ মধ্যে এমন পদক্ষেপ নিতে তোড়জোড় করছেন পিটার নাভারো, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘কাছের উপদেষ্টা’ হিসেবে পরিচিত।
নাভারোর এমন ‘প্রচেষ্টার’ বিষযে অবহিত ট্রাম্প প্রশাসনের এমন ব্যক্তিদের বরাতে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এ খবর প্রকাশ করেছে।
ফাইভ আইজ (Five Eyes) একটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জোট, যা পাঁচটি ইংরেজি ভাষাভাষী দেশ দ্বারা গঠিত। এই দেশগুলো হলঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। এই জোটটির মূল উদ্দেশ্য হল, দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য একে অপরের সাথে শেয়ার করা, যাতে আন্তর্জাতিক হুমকির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। ফাইভ আইজের গোয়েন্দা কার্যক্রম বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সাইবার সুরক্ষা এবং আরও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর সদস্য দেশগুলো একে অপরের সাথে অত্যন্ত গোপন এবং সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করে থাকে, যা তাদের নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
ফাইভ আইজের ইতিহাস এবং গঠন
ফাইভ আইজের শুরুর গল্পটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময় থেকে শুরু হয়। ১৯৪১ সালে গৌলেট কোড ব্রেকিং এগ্রিমেন্ট নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার প্রতিশ্রুতি দেয়। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এই চুক্তির সাথে যোগ দেয় এবং গঠন হয় ফাইভ আইজ জোট। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করা যা বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের সংকট বা হুমকি মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে।
ফাইভ আইজের কার্যক্রম
ফাইভ আইজের সদস্য দেশগুলো একে অপরের সাথে ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে থাকে, এবং এটি বেশ কয়েকটি অঞ্চলে কার্যকর। এই জোটের প্রধান কার্যক্রমগুলো নিম্নরূপ:
1. গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং (Intelligence Sharing)
ফাইভ আইজের সবচেয়ে বড় কার্যক্রম হলো, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং। এই তথ্যগুলো বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন:
- সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স (SIGINT): এটি টেলিযোগাযোগ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক সংকেত থেকে সংগৃহীত তথ্য। সদস্য দেশগুলো একে অপরের সাথে সিগন্যালস গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে, যার মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম, প্রতিরক্ষা কৌশল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়।
- হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT): এটি মানুষের মাধ্যমে সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য, যেমন গুপ্তচর বা অ্যাজেন্টদের দ্বারা সংগৃহীত তথ্য।
- এমআইসেল (Imagery Intelligence, IMINT): এটি স্যাটেলাইট বা আকাশচুম্বী ছবি থেকে সংগৃহীত তথ্য, যা ভূগোল বা আক্রমণাত্মক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে ব্যবহৃত হয়।
2. সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান (Counter-Terrorism)
ফাইভ আইজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি হলো সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম। সদস্য দেশগুলো একে অপরের সাথে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সম্পর্কে তথ্য শেয়ার করে এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কৌশল এবং গতিবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকে। বিশেষ করে, সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করতে এবং সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক ভাঙতে তারা একযোগভাবে কাজ করে।
ফাইভ আইজ সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা শনাক্ত করতে, জঙ্গিদের গতিবিধি অনুসরণ করতে এবং আক্রমণগুলো প্রতিরোধ করতে বিশাল ধরনের গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর, ফাইভ আইজ সদস্য দেশগুলো একত্রে কার্যক্রম চালিয়ে আসল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে।
3. সাইবার সুরক্ষা (Cybersecurity)
বর্তমান সময়ে সাইবার হামলা এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ফাইভ আইজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দেশগুলো একে অপরের সাইবার সুরক্ষা তথ্য শেয়ার করে, এবং একে অপরকে সাইবার আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখে। সাইবার আক্রমণ বাড়ানোর জন্য তারা হ্যাকিং, ফিশিং, র্যানসমওয়্যার, এবং অন্যান্য ডিজিটাল ঝুঁকির মোকাবিলা করতে যৌথভাবে কাজ করে।
এছাড়া, ফাইভ আইজ সদস্যরা একে অপরকে সাইবার হুমকি শনাক্ত করতে এবং প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং নেটওয়ার্ক রক্ষা করতে পারছে।
4. সিগন্যালস গোয়েন্দা (SIGINT) এবং নজরদারি
ফাইভ আইজের গোয়েন্দারা সিগন্যালস গোয়েন্দা বা কমিউনিকেশন ইন্টেলিজেন্সে অত্যন্ত দক্ষ। এটি বিভিন্ন ধরনের টেলিযোগাযোগ বা ইন্টারনেট ডেটা ট্র্যাক করে। ফাইভ আইজ সদস্য দেশগুলো একে অপরের সিগন্যালস গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে, যার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধী গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, এবং অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি চিহ্নিত করে থাকে।
5. গোয়েন্দা নজরদারি (Surveillance)
ফাইভ আইজের সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন দেশের উপর নজরদারি চালায়, বিশেষ করে সেই দেশগুলো যা সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এটি টেলিযোগাযোগ, সামাজিক মিডিয়া, এবং ইন্টারনেট পোর্টালগুলো নজরদারি করার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
চ্যালেঞ্জ এবং বিতর্ক
ফাইভ আইজ জোটটি সব সময় বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে, তাদের ব্যাপক নজরদারি এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন যে, এই গোয়েন্দা কার্যক্রম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার উপর হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকাররা সাধারণ মানুষের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যা অনেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন।
তবে, ফাইভ আইজ জোটের সদস্যরা এই সমালোচনাকে খণ্ডন করে এবং তারা যুক্তি দেয় যে, তাদের কার্যক্রমের লক্ষ্য শুধুমাত্র জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক হুমকি মোকাবিলা করা।
সামগ্রিকভাবে ফাইভ আইজের গুরুত্ব
ফাইভ আইজ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা জোট যা বিশ্বের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর সদস্য দেশগুলো একে অপরকে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে এবং একত্রে সন্ত্রাসবিরোধী, সাইবার সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কাজ করে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ, এবং অন্যান্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করতে ফাইভ আইজের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটির কার্যক্রম বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখে।
ফাইভ আইজের তথ্য শেয়ারিং এবং সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, কারণ বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং নতুন হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে।