সত্যজিৎ দাস:
মৌলভীবাজারের চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলের উত্তরসুর থেকে ইসবপুর পর্যন্ত প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাইপাস সড়ক প্রকল্পকে দ্রুত বাস্তবায়ন এবং স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে প্রকৌশল,প্রশাসনিক ও সামাজিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিকল্পনায় আধুনিক ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থা, পরিবেশসম্মত ড্রেনেজ নকশা,প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ সংরক্ষণ এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী নির্মাণ কৌশলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী,প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি শুধু একটি সড়ক নির্মাণ উদ্যোগ নয়; বরং শ্রীমঙ্গল শহরের যানজট নিরসন,পর্যটন শিল্পের বিকাশ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং জলাবদ্ধতার সম্ভাব্য ঝুঁকিকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে,প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ড্রোন,জিপিএস এবং ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভের মাধ্যমে দ্রুত জমি ও স্থাবর সম্পত্তির জরিপ সম্পন্ন করা হলে জমির সীমানা নির্ধারণে ভুল কমবে,বিরোধ ও মামলা হ্রাস পাবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে।
একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবেই আইন অনুযায়ী প্রাপ্য তিন গুণ (৩০০ শতাংশ) ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পাবে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উত্তরসুর ও ইসবপুর ইউনিয়ন পরিষদে অস্থায়ী ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বুথ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে জমির খতিয়ান,নামজারি, পর্চা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহজেই যাচাই করে জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া যায়।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে,জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ),স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং জমির মালিকদের নিয়ে নিয়মিত মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হলে বিরোধ মাঠপর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে এবং আদালতনির্ভর জটিলতা কমবে।
পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে,প্রস্তাবিত বাইপাসটি পাহাড়ি ছড়া এবং হাইল হাওরের অববাহিকা অতিক্রম করবে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতে শ্রীমঙ্গল শহর ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে ভুরভুরিয়া,বিলাস ও কালাপুর ছড়ার মুখে ছোট বক্স কালভার্ট নির্মাণের পরিবর্তে বড় স্প্যানের গার্ডার ব্রিজ বা উন্মুক্ত চ্যানেল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে পাহাড়ি ঢলের পানি বাধাহীনভাবে প্রবাহিত হবে এবং পলি জমে পানি চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমবে।
একই সঙ্গে ‘গ্রিন রোডস ফর ওয়াটার’ ধারণা অনুসরণ করে সড়কের দুই পাশে সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক,ক্যাচমেন্ট পিট,সবুজ বাফার জোন এবং স্পিলওয়ে নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে,যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত প্রাকৃতিক জলপথে নিষ্কাশিত হতে পারে।
প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে নিচু এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত আন্ডারপাস,ইকো-ডাক্ট বা ওয়াটার প্যাসেজ নির্মাণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ছড়ার মুখে সিল্ট ট্র্যাপ বা পলি জমার চেম্বার নির্মাণ এবং বর্ষা মৌসুমের আগে নিয়মিত তা পরিষ্কার রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় শ্রীমঙ্গলের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় একটি ‘হাইব্রিড বাইপাস’ মডেলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ মডেলে অধিকাংশ অংশে দুই লেনের সড়ক মাটির ওপর নির্মাণ করা হবে। তবে যেখানে ছড়া,খাল বা পানির প্রধান প্রবাহ রয়েছে, সেখানে মাটির বাঁধের পরিবর্তে পিলারের ওপর ভায়াডাক্ট বা উড়াল সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনাকারীর মতে,এতে নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে,পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমে আসবে।
প্রস্তাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে সরকারি খাস জমি এবং চা-বাগানের অব্যবহৃত লিজকৃত জমির ওপর দিয়ে সড়কের অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় কমবে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
নতুন করে ব্যয়বহুল কংক্রিটের ড্রেন নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান কোদালীছড়া,সংযুক্ত খাল এবং হাইল হাওরমুখী পানি প্রবাহপথ পুনঃখনন ও প্রশস্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাকারীর মতে,এতে নির্মাণ ব্যয় কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
পরিকল্পনায় শুরুতেই চার বা ছয় লেন নির্মাণের পরিবর্তে প্রথম পর্যায়ে প্রশস্ত দুই লেনের সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যাতে সহজেই চার লেনে উন্নীত করা যায়,সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত জায়গা সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রাথমিক ব্যয় কমবে,নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হবে এবং জনভোগান্তিও কম হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছে,সরকারি খাস জমির ব্যবহার,চা-বাগানের অব্যবহৃত জমির সদ্ব্যবহার,আংশিক ভায়াডাক্ট নির্মাণ এবং বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে প্রকল্পে প্রায় ৮০ থেকে ১২০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব,যা মোট অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের সমান। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং জলাবদ্ধতা নিরসন ব্যয়ও কমে আসতে পারে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনাটিতে বলা হয়েছে,আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি অধিগ্রহণ,স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা,স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পরিবেশসম্মত প্রকৌশল নকশা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে উত্তরসুর-ইসবপুর বাইপাস প্রকল্পটি শ্রীমঙ্গলের জন্য একটি পরিবেশবান্ধব,ব্যয়-সাশ্রয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছেন: যোশেফ দাশগুপ্ত যশো।

