ভারতের বাণিজ্যিক নগরী মুম্বাইয়ে পবিত্র আশুরার তাজিয়া মিছিলে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে বিষাক্ত ক্যাপসুল খাইয়ে একযোগে হত্যা করার এক লোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে দেশটির পুলিশ। এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি থেকে রক্ষা পেয়েছে মিছিলে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষ।
গত শুক্রবার (২৬ জুন ২০২৬) তাজিয়া মিছিলের ভেতরে সাধারণ মানুষের মাঝে কৌশলে বিষাক্ত ক্যাপসুল বিলি করার সময় ফাইয়াজ প্রেমজি নামের এক যুবককে হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। পরে জিজ্ঞাসাবাদে আটক ওই যুবক স্বীকার করে যে, মিছিলে উপস্থিত অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে বিষপ্রয়োগে মেরে ফেলার সুনির্দিষ্ট ও আত্মঘাতী পরিকল্পনা ছিল তার।
ব্যথানাশকের নামে ইঁদুর মারার বিষ বিতরণ:মুম্বাই পুলিশের তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেয়ে রোডের রেহমতাবাদ কবরস্থানের নিকটবর্তী আশুরার মূল শোভাযাত্রায় ফাইয়াজ ওই বিষাক্ত ক্যাপসুলগুলো বিলি করছিল। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সে ওই মরণঘাতী ক্যাপসুলগুলোকে বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের ব্যথানাশক (Painkiller) এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিকারী (Immunity Booster) ওষুধ হিসেবে প্রচার করছিল।
ফাইয়াজের এই ধোঁকাবাজিতে পড়ে মিছিলে থাকা ১১ জন মানুষ সেই ক্যাপসুল সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলেন এবং মুহূর্তের মধ্যেই মারাত্মক পেটের ব্যথা ও বমির সমস্যায় আক্রান্ত হন। তাদের সবাইকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বর্তমানে তারা সবাই আশঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, ওই ক্যাপসুলগুলোর ভেতরে ‘জিঙ্ক ফসফাইড’ (Zinc Phosphide) নামক অত্যন্ত প্রাণঘাতী রাসায়নিকের উপস্থিতি ছিল, যা সাধারণত ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।৩ নারী স্বেচ্ছাসেবকের তৎপরতায় রক্ষা পেল হাজারো প্রাণ:মুম্বাইয়ের বাইকুল্লা থানা পুলিশ জানিয়েছে, ওই দিন তাজিয়া মিছিলে অংশ নেওয়া তিন নারী স্বেচ্ছাসেবকের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার কারণেই মূলত এই অকল্পনীয় গণহত্যা এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ওই তিন নারীর একজন প্রথমে ফাইয়াজকে সন্দেহজনকভাবে ডাব্বা থেকে ওষুধ বিতরণ করতে দেখেন। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে বাধা দেন এবং স্থানীয় পুলিশকে খবর দেন। একই সঙ্গে তারা মুহূর্তের মধ্যে লাউডস্পিকারে মাইকিং করে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে ওই বিতরণ করা ক্যাপসুল না খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।
ফলে লাখো মানুষ নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।উদ্ধার ১৪,৯০০ ক্যাপসুল ও আরও বড় ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তুতি:মুম্বাই পুলিশের উপকমিশনার জয়ন্ত মীনা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, দ্রুত অভিযান চালিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত ফাইয়াজের কাছ থেকে অন্তত ১৪ হাজার ৯০০টি বিষাক্ত ক্যাপসুল জব্দ করেছে। তবে পুলিশ তাকে আটক করার পূর্বেই সে মিছিলে বেশ কিছু ক্যাপসুল বিলি করতে সক্ষম হয়েছিল।পুলিশের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই চক্রান্তকে আরও বড় ও দেশব্যাপী রূপ দিতে ফাইয়াজ ইতিমধ্যে বাজার থেকে আরও ৩০ হাজার খালি ক্যাপসুল এবং ৫০ কেজি ফসফরাস কেনার জন্য কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রেখেছিল।
আটক ফাইয়াজকে শনিবার (২৭ জুন) স্থানীয় আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে (Remand) পাঠানোর নির্দেশ দেন।জিঙ্ক ফসফাইডের ভয়াবহতা:চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, জিঙ্ক ফসফাইড মানবদেহের জন্য একটি চরম মাত্রার টক্সিক বা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এটি কোনোভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে তা পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে তীব্র বিক্রিয়া ঘটিয়ে ফসফিন ($PH_3$) নামক এক ধরনের অত্যন্ত প্রাণঘাতী বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন করে।
এই ক্ষতিকর গ্যাসটি সরাসরি রক্তের মাধ্যমে মানুষের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃত, কিডনি এবং মস্তিষ্ককে চিরতরে বিকল করে তোলে। এই বিষের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক (Antidote) নেই।জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধী ফাইয়াজ প্রেমজি সরাসরি স্বীকার করে বলেন, ‘আমি অন্তত ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম।’
এই জঘন্য চক্রান্তের কারণে তার বিরুদ্ধে বাইকুল্লা থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ১২৩ ধারায় (বিষ বা অনুরূপ উপায়ে মানুষের ক্ষতি করার অপরাধ) একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা রুজু করা হয়েছে। আটক এই মূল পরিকল্পনাকারীর পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ বা ‘স্লিপার সেল’ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (NIA) তদন্তে নেমেছে।

