আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে চলমান শান্তি আলোচনার মাঝেই দুই দেশের সামরিক সংঘাত ও পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরম যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান সমঝোতা স্মারকের কোনো শর্ত যদি ওয়াশিংটন ভঙ্গ করে, তবে তার জবাব হবে ‘দ্রুত ও চূড়ান্ত’। আজ শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রকে এমন কড়া ভাষায় স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টাইমস অফ ইসরায়েল-এর এক প্রতিবেদন থেকে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তথ্য জানা গেছে।ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক প্রধান ও বর্তমান সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একটি পোস্ট করেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন: আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বা আঞ্চলিক মিত্র বাহিনীকে সরাসরি সমর্থন দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের প্রথম অনুচ্ছেদ (Article 1) লঙ্ঘন করেছে।
একই সাথে স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালীতে উসকানিমূলক সামরিক তৎপরতা ও উত্তেজনা বাড়িয়ে চুক্তিটির পঞ্চম অনুচ্ছেদ (Article 5) ভঙ্গ করেছে ওয়াশিংটন।
মোহসেন রেজাই স্পষ্ট করে বলেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারকের যেকোনো ধারা বা শর্ত লঙ্ঘনের জবাব তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দ্রুত, কঠোর ও চূড়ান্তভাবে দেওয়া হবে।
সংঘাতের সূত্রপাত: জাহাজে ড্রোন হামলা ও মার্কিন বিমানহানা
এই নতুন উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে গত বৃহস্পতিবার, যখন কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালীতে একটি বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা চালানো হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘটনার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করে একে ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তির মূর্খতাপূর্ণ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন।
ট্রাম্পের এই কঠোর বার্তার পরপরই মার্কিন সামরিক বাহিনী শুক্রবার (২৬ জুন) ইরানের দক্ষিণ উপকূলের একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারের ড্রোন হামলার জবাবে শুক্রবার তারা ইরানের অভ্যন্তরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত কেন্দ্র এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনা ধ্বংস করেছে। মার্কিন এই বোমাবর্ষণের কারণে পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া আন্তর্জাতিক নাবিকদের উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয় উদ্ধারকারী দলগুলো।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তেহরান দাবি করেছে, মার্কিন বাহিনীই প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। হরমুজ প্রণালীতে যে পণ্যবাহী জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল, সেটি পারস্য উপসাগরের জলপথে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অননুমোদিতভাবে চলাচল করছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থেই ইরান সেখানে পদক্ষেপ নিয়েছিল।
শুক্রবারের মার্কিন হামলার পর ইরানও দমে যায়নি। তারা জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ও ব্যবহৃত একাধিক কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরানি বাহিনী।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সুইজারল্যান্ডের টেবিলে যখন দুই দেশের কূটনীতিকরা শান্তি ফেরানোর দ্বিতীয় দফা আলোচনা চালাচ্ছেন, তখন মাঠপর্যায়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও আয়াতুল্লাহ খামেনির সামরিক উপদেষ্টাদের এই মুখোমুখি অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। উভয় পক্ষই এখন একে অপরকে লিখিত চুক্তি ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করছে, যা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।

