জীবনের প্রতিটি সফলতার পেছনে একজন নীরব যোদ্ধার অবদান থাকে, আর সেই যোদ্ধার নাম বাবা। তিনি হয়তো সবসময় আবেগ প্রকাশ করেন না, কিন্তু সন্তানের সুখ ও ভবিষ্যতের জন্য নিজের সমস্ত স্বপ্ন, শ্রম ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বাবা দিবস। এই দিবসটি বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ। বাবা দিবস উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ও ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিন মোহাম্মদ ও রুকনুজ্জামান হুমাঈদী।
১. বাবা: জীবনের প্রথম নায়ক, শেষ আশ্রয়
বিনিময়ে কোনকিছু পাওয়ার প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে যে মানুষটা সারা জীবন আমাদের শুধু দিয়েই যায়, সে আর কেউ নয় “আমাদের বাবা”। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে বাবার স্থান অনন্য। বাবা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন, তিনি সন্তানের সাহস ও নির্ভরতার সবচেয়ে বড় উৎস। সন্তানের ভালো থাকা, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখানোর জন্য একজন বাবা নীরবে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে তিনি সন্তানের স্বপ্ন পূরণে নিরলস পরিশ্রম করে যান। তাঁর কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর ভালোবাসা, আর নীরবতার মধ্যে থাকে সন্তানের প্রতি অসীম মমতা। বাবা পরিবারের ছায়াদানকারী বৃক্ষের মতো। জীবনের ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে তিনি পরিবারকে পরম যত্নে আগলে রাখেন। সন্তানের ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস জোগান, আর সফলতায় নীরবে গর্ব অনুভব করেন। বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবীকে দেখার যে অনুভূতি, তা কখনোই ভোলার নয়। তার পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি। বাবা দিবস শুধু একটি বিশেষ দিন নয়; এটি বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের বড় উপলক্ষ। আমরা হয়তো সবসময় মুখে বলতে পারি না, কিন্তু আমাদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে বাবার অবদান অমূল্য। তাই বাবা দিবসে সকল বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।
সাবিকুন্নাহার আঁখি
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
২. বাবা দিবস নয়, প্রতিদিনই বাবার জন্য
প্রতিটি সন্তানের তার বাবাকে ‘ভালোবাসি’ বলার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন হয় না। কারণ বাবা কোনো এক দিনের অনুভূতি নন; তিনি পুরো জীবনের ভরসা। ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়তো ‘বাবা দিবস’ হতে পারে, কিন্তু একজন সন্তানের কাছে বাবার মূল্য প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্তে সমান। মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ পায় আদরে, আর বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় দায়িত্বে। মা জিজ্ঞেস করেন, ‘খেয়েছো?’ আর বাবা নীরবে নিশ্চিত করেন যেন খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। তাই বাবার ভালোবাসা সবসময় চোখে পড়ে না, কিন্তু জীবনকে ফিরে দেখলে তার ছাপ সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শিখি, বাবা কোনো সুপারহিরো নন। তিনিও ক্লান্ত হন, দুশ্চিন্তা করেন, কখনো কখনো ভেঙেও পড়েন। তবুও পরিবারের সুখের জন্য নিজের কষ্ট আড়াল করে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করেন। যে মানুষটি নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দেন, তার প্রতি ভালোবাসা বা কৃতজ্ঞতা কোনো এক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাই আমার কাছে বাবা দিবস কোনো উদযাপন নয়; বরং বাবার ত্যাগ, ভালোবাসা ও অবদানকে নতুন করে উপলব্ধি করার একটি উপলক্ষ। পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা।
সাদিয়া মুতমায়িন্নাহ
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
৩. বাবা: আমার জীবনের নীরব নায়ক
বাবা দিবস উপলক্ষে সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা আমার বাবা-মা যেন সবসময় সুস্থ ও ভালো থাকেন। আজ সেই মানুষটির কথা বলতে চাই, যাকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। অথচ তাকে কখনো ঠিকভাবে বলা হয়নি, “আব্বু, আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি।” আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ আমার আব্বু। আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া তিনি অপূর্ণ রাখেননি। আমরা কীভাবে ভালো থাকব, কীভাবে হাসিখুশি থাকব, সেই চিন্তাই তিনি সবসময় করেন। বাবার কাছে মেয়েরা একটু বেশিই প্রিয় হয়, এত বড় হওয়ার পরও বাড়িতে থাকলে তিনি নিজের হাতে খাইয়ে দেন। বাহিরে থাকলে এমন কোনো রাত যায় না, যখন তিনি খোঁজ নেন না আমি খেয়েছি কি না। ক্যাম্পাসে থাকলে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো খুব মনে পড়ে। বাবাদের ভালোবাসা নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর। তারা নিজেদের সুখ ত্যাগ করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। আল্লাহর কাছে আমার দোয়া আমার আব্বু-আম্মু এবং পৃথিবীর সকল বাবা-মা যেন সুস্থ, নিরাপদ ও ভালো থাকেন।
কানিজ ফাতিমা অনন্যা,
শিক্ষার্থী, কমিউমিকেশন এন্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
৪. ব্যস্ততার যুগে বাবার সঙ্গে সময় কাটানো প্রয়োজন
প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যস্ত এই সময়ে আমরা অনেকেই অজান্তেই বাবার সঙ্গে কাটানো মূল্যবান সময় হারিয়ে ফেলছি। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ কমে যাচ্ছে। অথচ একজন বাবা দিনের শেষে সন্তানের খোঁজ নিতে, তার ভালো-মন্দের কথা শুনতে এবং তার সাফল্য-ব্যর্থতার গল্প জানতে অপেক্ষা করেন। বাবারা অনেক সময় নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন না, কিন্তু সন্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও চিন্তা কখনো কমে না। একটি ফোনকল, কিছু আন্তরিক কথা কিংবা একসঙ্গে কাটানো সামান্য সময়ও একজন বাবার কাছে অনেক মূল্যবান হতে পারে। আমরা যখন দূরে থাকি, তখন হয়তো সবচেয়ে বেশি অনুভব করি বাবার সেই নীরব উপস্থিতি ও যত্ন।
বাবা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে সময় দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাই ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের উচিত বাবার জন্য কিছু সময় রাখা, তার কথা শোনা এবং তাকে অনুভব করানো যে তিনি আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।
সালসাবিল জান্নাত মেধা,
শিক্ষার্থী, ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
৫. বটবৃক্ষের ছায়া: বাবা দিবস ও কিছু কথা
বাবা এমন একটি শব্দ যেখানে মিশে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ও নিঃসার্থ ভালোবাসা। আমরা বাবাকে বটবৃক্ষের সাথে তুলনা করলেও বাবার ভূমিকা আমাদের জীবনে অতুলনীয়। নিজের সমস্ত ক্লান্তি ও স্বপ্নকে অনায়াসে বিসর্জন দিতে পারেন কেবল একজন বাবাই। শৈশবে আঙুল ধরে হাঁটতে শেখানো থেকে শুরু করে জীবনের কঠিনতম সময়ে ছায়ার মতো পাশে থাকা বাবার অবদান কখনো পরিমাপ করা যায় না। মায়েরা যেমন স্নেহের আঁচল দিয়ে আমাদের আগলে রাখেন, বাবারা ঠিক তেমনি আড়ালে থেকে শক্ত দেয়ালে মতো সমস্ত ঝড়-ঝাপটা থেকে পরিবারকে রক্ষা করেন।
সময়ের নিয়মে আমরা বড় হই, ব্যস্ত হয়ে পড়ি নিজেদের পৃথিবীতে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, বৃদ্ধ বয়সে আমাদের একটুখানি সময় আর ভালোবাসাই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অন্তহীন ভালোবাসা।
নাদিয়া ইয়াসমিন তিশা
শিক্ষার্থী, লোক-প্রশাসন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

