জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং তাদের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, জলবায়ু অভিবাসীদের সংকট জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে সংবাদমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) অডিটোরিয়ামে কারিতাস বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সাংবাদিকদের সঙ্গে এক জাতীয় পরামর্শ সভায় এ মতামত উঠে আসে।
সভায় অতিথি আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হাসান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য শাহীন হাসনাত।
কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (সিডিআই) থিউফিল নকরেক স্বাগত বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, বাস্তুচ্যুত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সংস্থাটির বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. জামিল আহমেদ। সমাপনী বক্তব্য দেন কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা।
সোহরাব হাসান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকট দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। এ সংকট মোকাবিলায় পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকাংশই শহরে এসেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রফিকুল ইসলাম আজাদ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ‘ক্লাইমেট যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাদের সংগ্রামের গল্প আরও বেশি করে গণমাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন। এজন্য জলবায়ু বিষয়ক সাংবাদিকদের নিয়ে পৃথক নেটওয়ার্ক বা ফোরাম গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।
শাহীন হাসনাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়লেও আন্তর্জাতিক সহায়তা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আলেকজান্ডার ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান খুবই কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকেই। তিনি জলবায়ু অর্থায়ন ও অনুদানের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাংবাদিক ড. দীপু সিদ্দিকী বলেন, জলবায়ু অভিবাসীদের সংকট নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরিতে সাংবাদিকরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, নগর জীবনের সংকট, সামাজিক বঞ্চনা এবং সরকারি সেবাপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। তারা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান।
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের কারণে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসনের হার ক্রমাগত বাড়ছে। এসব পরিবার ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নিলেও অনিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সীমিত সুযোগসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
কারিতাস বাংলাদেশ জানিয়েছে, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংস্থাটি এ পর্যন্ত ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কাছে বিভিন্ন সেবা পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ১৪ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক এবং ৩২৯টি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র গঠনে সহায়তা করেছে।
সভা সূত্রে আরও জানা যায়, গবেষণা সংস্থা রামরু (RMMRU) ও এসসিএমআর (SCMR)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

