রাশিয়ার কিছু গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি ফাঁসের পর আন্তর্জাতিক সামরিক ও ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ফাঁস হওয়া চাঞ্চল্যকর নথি অনুযায়ী, ইরান তাদের ভবিষ্যৎ ‘সুখোই’-৩৫এসই (Su-35SE) যুদ্ধবিমান বহরের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে এক বিশাল ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার পেতে যাচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এই প্রথম ইরান একটি সত্যিকারের আধুনিক ও বহুমুখী আকাশযুদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমার শক্তির ভারসাম্যকে নতুন করে পুনর্নির্ধারণ করতে পারে।
ইউক্রেন-সংশ্লিষ্ট একটি তদন্তকারী প্ল্যাটফর্ম এবং হ্যাকারদের মাধ্যমে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল নথিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ইরানকে মূলত “কে১০” ছদ্মনামে উল্লেখ করা হয়েছে। নথির তথ্যমতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে অর্থাৎ ২০২১ সালের ১০ জুন রুশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘রস্টেক’ এবং বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইরকুট কর্পোরেশন’—এর সাথে ইরানের এই চুক্তিটি (চুক্তি নম্বর: R/19K1011141768) স্বাক্ষরিত হয়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার নিজস্ব অস্ত্রের তীব্র টানাপোড়েন এবং পশ্চিমাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, ২০২৫ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইরানের জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে। পুরো সামরিক প্যাকেজটির আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৫.৪ থেকে ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার。
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান কেবল নামমাত্র সুখোই যুদ্ধবিমান কিনছে না, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী স্কোয়াড্রন পরিচালনার জন্য রাশিয়ার সেরা প্রযুক্তির বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ডার দিয়েছে:
আর-৭৭ (R-77) ক্ষেপণাস্ত্র: এই ‘বিয়ন্ড-ভিজুয়াল-রেঞ্জ’ বা দৃষ্টিসীমার বাইরের রাডার-নির্ভেদ্য ক্ষেপণাস্ত্রটি অর্ডার দেওয়া হয়েছে ৪২টি। এর মাধ্যমে ইরান অনেক দূর থেকেই প্রতিপক্ষের এফ-১৫, এফ-১৬ বা পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানকে লক ও ধ্বংস করতে পারবে।
আর-৭৩ (R-73) ক্ষেপণাস্ত্র: ডগফাইট বা কাছাকাছি আকাশযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এই ক্ষেপণাস্ত্রটি অর্ডার দেওয়া হয়েছে ১২৩টি। এটি পাইলটের হেলমেট-মাউন্টেড টার্গেটিং সিস্টেমের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে।
কেএইচ-৩১ (Kh-31) ক্ষেপণাস্ত্র: চুক্তি অনুযায়ী এই রাডার-বিধ্বংসী এবং জাহাজ-বিধ্বংসী হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি অর্ডার দেওয়া হয়েছে ৪২টি। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের প্যাট্রিয়ট বা থাড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের শক্তিশালী রাডার নিমেষেই অকেজো করে দেওয়া সম্ভব।
কেএইচ-৩৮ (Kh-38) ক্ষেপণাস্ত্র: নিখুঁত নিশানাভেদী এই ট্যাকটিক্যাল ক্ষেপণাস্ত্রটি অর্ডার দেওয়া হয়েছে ১২০টি, যা দিয়ে দূর থেকে শত্রুর বাঙ্কার, কমান্ড সেন্টার ও লজিস্টিকস ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালানো যায়।
আক্রমণাত্মক নীতি ও ইসরায়েল-উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
ইরানের বর্তমান বিমান বাহিনী মূলত ১৯৭৯ সালের আগের পুরনো আমেরিকান বিমান (যেমন এফ-১৪ টমক্যাট, এফ-৪ ফ্যান্টম) দিয়ে কোনোমতে চলছে। সুখোই-৩৫এসই এবং এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তর্ভুক্তি ইরানের প্রতিরক্ষামূলক সামরিক নীতিকে রাতারাতি আক্রমণাত্মক নীতিতে রূপান্তর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর (যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত) জন্য কেএইচ-৩১ রাডার-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি তাদের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে। এছাড়া, পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে নৌ-যান চলাচলের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে।
এই ঘটনাটি পশ্চিমা বিশ্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি বিকল্প প্রতিরক্ষা-শিল্প ইকোসিস্টেম তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়া যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য ইরানের কাছ থেকে ড্রোন প্রযুক্তি পেয়েছে, বিনিময়ে ইরান পাচ্ছে রাশিয়ার সেরা আকাশযুদ্ধ প্রযুক্তি। ইতিমধ্যে ইরান রাশিয়া থেকে অন্তত ৮টি ইয়াক-১৩০ (Yak-130) উন্নত ট্রেইনার বিমান পেয়েছে, যা দিয়ে ইরানি পাইলটরা সুখোই-৩৫ বিমান চালানোর আধুনিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
যদিও মস্কো বা তেহরান কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য ফাঁসের সত্যতা স্বীকার করেনি, তবে নথিতে থাকা সিরিয়াল নম্বর, যন্ত্রাংশের বিবরণ এবং উৎপাদনের বিশদ বিবরণ দেখে সামরিক বিশ্লেষকরা একে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করতে এবং নতুন করে বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ক্রয়ের প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হতে পারে।

