সত্যজিৎ দাস (মৌলভীবাজার):
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভায় চলমান হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচিতে একাধিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার লক্ষ্যে পরিচালিত এই জাতীয় কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব,তদারকির ঘাটতি এবং দায়িত্বহীনতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে জানা গেছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়,নির্ধারিত একাধিক কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি নেই। পৌর শহরের মিশন রোড এলাকার একটি কেন্দ্রে ২৯ এপ্রিল গিয়ে দেখা যায়,কোনো স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াই একজন অপ্রশিক্ষিত কর্মী শিশুদের টিকা দিচ্ছেন। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত টিকাদান কর্মী ঝুমুর দাস জানান,নির্ধারিত স্বেচ্ছাসেবক ব্যক্তিগত কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।
একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় ৩০ এপ্রিল কোর্ট রোডের একটি ক্লিনিকে। সেখানে নির্ধারিত সময়ের আগেই টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি। এতে টিকা নিতে আসা অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী,প্রতিটি কেন্দ্রে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী ও দুইজন স্বেচ্ছাসেবক থাকার কথা। তবে বাস্তবে অনেক কেন্দ্রে এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও নার্সের অনুপস্থিতি, আবার কোথাও অপেশাদার ব্যক্তির মাধ্যমে টিকা প্রয়োগের মতো ঘটনা ঘটছে, যা শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া টিকাদান কার্যক্রমের সময়সূচি না মানার অভিযোগও উঠেছে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা থাকলেও অনেক কেন্দ্র দুপুরের আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বিশেষ করে কর্মজীবী অভিভাবকরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
টিকা সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় না রাখা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার মতো বিষয়গুলো শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
WHO-এর উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।অপ্রশিক্ষিত কর্মী দ্বারা টিকাদানে শিশুদের আগামীর জন্য কি বয়ে আনবে,তা পরিচালনা পর্ষদ জানেন। সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এই কর্মসূচিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এহেন কর্মকান্ড নিজ চোখে দেখলে,সেবাগ্ৰহী শিশুদের ভবিষ্যৎ-এ কি বার্তা বহন করবে,তা আদৌ জানা নেই।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুল ইসলাম পাবেল বলেন,“বিষয়টি পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে,তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন জানান,“সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”
এদিকে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন জানান,’অভিযোগের বিষয়ে অবগত হয়ে তিনি বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,গত ১৫ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ১৪৬ জন এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৩৮ হাজার ৩০১ জন। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য,চলমান এমআর টিকাদান কর্মসূচির আওতায় অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩ বা ৪টা পর্যন্ত এবং স্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা রয়েছে। কর্মজীবী অভিভাবকদের সুবিধার্থে কিছু এলাকায় সময় বাড়ানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটি উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে ২১ মে ২০২৬ পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে এবং প্রয়োজনে সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন,প্রশাসনিক তদারকি জোরদার না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মসূচির লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। তারা দ্রুত প্রতিটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা, সময়সূচি কঠোরভাবে মানা এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।

