২০২৬ সালের মে মাসে এসে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছে, যা স্পষ্টতই এক নতুন ধরনের ‘শীতল যুদ্ধ’ বা স্নায়ুযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং বারবার এর মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে যুদ্ধের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে।
যে যুদ্ধের সামরিক ভার আগে মূলত ইসরায়েল বহন করত, এখন তার বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা এককভাবে ওয়াশিংটনের কাঁধে এসে চেপেছে। হোয়াইট হাউস বর্তমানে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতিতে অটল থেকে সমুদ্রপথে অবরোধ জোরদার করে তেহরানকে নতি স্বীকার করাতে চাইছে। তবে ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ইরানকে প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের হিসাবকে ভুল প্রমাণ করছে।
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে গিয়ে আমেরিকা এখন নিজেই নিজের পাতা ফাঁদে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার এবং তার দীর্ঘদিনের মিত্রদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার একক আধিপত্যের পরিপন্থী একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো, যারা জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা এখন ওয়াশিংটনের এই হঠকারী ইরান নীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যুদ্ধের বদলে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে এবং কেউ কেউ ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাবও তুলছে।
ইউরোপের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো চীনের সাথে স্পেনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং বেইজিংয়ের সাথে মাদ্রিদের ১৯টি কৌশলগত চুক্তি। একইভাবে কানাডাও আমেরিকার ইরান নীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে। আমেরিকার অতি বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত জার্মানি ও ফ্রান্সও এখন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে চীনের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখছে। এমনকি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোও (জিসিসি) জেদ্দা সম্মেলনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। ভৌগোলিক বাস্তবতায় ইরানকে এই অঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেনে নিয়ে তারা এখন বিকল্প শক্তির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সুখকর নয়। জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের মান কমে যাওয়ায় মার্কিন জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক মন্দা ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা।
এমনকি ইসরায়েলও এই যুদ্ধের প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না; যে যুদ্ধ শুরু করার পেছনে তাদের বড় ভূমিকা ছিল, এখন সেটিই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ওলটপালট করে দিচ্ছে যা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। দিনশেষে প্রশ্নটি এখন আর এটি নয় যে ইরান কতদিন টিকে থাকবে, বরং প্রশ্ন হলো আমেরিকা নিজের কতটুকু ক্ষতি স্বীকার করে এই অর্থহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। ওয়াশিংটনের নেওয়া অর্থনৈতিক অবরোধ এখন বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে আসছে, যা সম্ভবত বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ইতি টানার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

