মোঃ রেজাউল হক শাকিল, ব্রাহ্মণপাড়া:
কাক ডাকা ভোর। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি। মেঘলা আকাশ, রাতের বৃষ্টির ছাপ এখনো মাটিতে। এমন সময় কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বড়ধুশিয়া বাজার (ব্রিজের উপর) জড়ো হন কয়েকশো শ্রমিক। দিনভিত্তিক শ্রম বিক্রির জন্য বসে এই অস্থায়ী বাজার, যা উপজেলার সবচেয়ে বড় শ্রমিক হাট হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা-১০টা পর্যন্ত জমজমাট থাকে এই বাজার। শ্রমিকদের হাতে কাস্তে, কাঁধে ছোট ব্যাগ—যেখানে লুঙ্গি-গামছা রাখা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ, ময়মনসিংহ ও সিলেট এলাকা থেকে আসা শ্রমিকরা এখানে জড়ো হন। মূলত বোরো মৌসুমে ধান কাটার কাজকে কেন্দ্র করেই এই শ্রমিক সমাগম ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই সময় ব্রাহ্মণপাড়ায় ধান কাটার মৌসুম আগে শুরু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এখানে আসেন। কাজ শেষ হলে তারা আবার নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান অথবা অন্য অঞ্চলে পাড়ি জমান।
শ্রমিকদের সঙ্গে চলে পণ্যের মতো দর কষাকষি। চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন একজন শ্রমিকের মূল্য ১০০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। দর মিললেই শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।
উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা জেলার শ্রমিক আলফাজ মিয়া জানান, অভাবের তাড়নায় তিনি এখানে কাজ করতে এসেছেন। আমাদের এলাকায় এখনো ধান কাটা শুরু হয়নি। তাই পরিবার চালাতে এখানে আসতে হয়। গত বছরও এসেছিলাম। কাজ শেষ হলে আবার বাড়ি ফিরে যাব, বলেন তিনি।
ময়মনসিংহের আজাদ মিয়া বলেন, ভোর থেকে দাঁড়িয়ে আছি। রাতে বৃষ্টি হয়েছে, আকাশও খারাপ। আজ কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবুও অপেক্ষা করছি, কারণ খালি হাতে বাড়ি ফেরা যাবে না।
এদিকে শ্রমিক নিতে আসা স্থানীয় কৃষক মানিক মিয়া জানান, গতকাল এক কানি (৬০ শতক)জমির অর্ধেক ধান কেটেছি। বৃষ্টির কারণে কাজ ধীর হয়ে গেছে। আজ অতিরিক্ত শ্রমিক নিতে বাজারে এসেছি।
আজকে মনে হচ্ছে গত দিনের চেয়ে একটু কম দামে শ্রমিক নিতে পারো।
প্রতিদিনের এই শ্রমিক বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার অভাব হয় না। মূলত সচ্ছল কৃষক কিংবা যাদের শ্রমিক প্রয়োজন, তারা এখানে এসে দরদাম ঠিক করে শ্রমিক নিয়ে যান। এরপর এসব শ্রমিক উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ধান কাটার কাজে নিয়োজিত হন।
স্থানীয়দের মতে, এই শ্রম বাজার শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগই তৈরি করছে না, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি অস্থায়ী কর্মসংযোগও গড়ে তুলছে। বোরো মৌসুমজুড়ে এভাবেই ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই প্রাণ ফিরে পায় ব্রাহ্মণপাড়ার এই শ্রমিক হাট।

