ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পূর্ণমাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধের পথে হাঁটছেন। তবে এই কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো কোনো ছাড় দিতেও রাজি নন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক জটিল অচলাবস্থায় আটকা পড়েছে। এই কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কঠোর নৌ-অবরোধ।
যুক্তরাষ্ট্র কেবল কৌশলগত পানিপথগুলোই আটকে দিচ্ছে না, বরং ভারত মহাসাগরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন তেলবাহী জাহাজগুলোকেও টার্গেট করছে। এই জাহাজগুলো মূলত চীনের কাছে তেল পৌঁছে দেয় এবং বিনিময়ে ইরানে সামরিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে। ট্রাম্পের এই সাঁড়াশি অভিযান ইরানের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে দেশটির তেল রপ্তানি খাত এখন ধ্বংসের কিনারে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে পড়ছে। দেশটির খার্গ দ্বীপের স্টোরেজ ট্যাংক ও তেলক্ষেত্রগুলো এখন কানায় কানায় পূর্ণ, অন্যদিকে ইসরায়েলি হামলায় পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনিং সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান তেল উত্তোলন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘ সময় তেলের কূপগুলো বন্ধ থাকলে ভেতরের প্রাকৃতিক চাপ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
শুধু তেল নয়, ট্রাম্পের আঘাত এবার ডিজিটাল মুদ্রার জগতেও পৌঁছেছে। সম্প্রতি আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট ৩৪৪ মিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ধারণা করা হয়, ইরানের হাতে থাকা প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদের বড় অংশই রেভল্যুশনারি গার্ডের নিয়ন্ত্রণে, যা এখন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও হ্যাকারদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এই বিশাল চাপের মুখে ইরানের পাল্টা কৌশল হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। তেহরান আশা করছে, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হবেন। তবে ট্রাম্পের লক্ষ্য ভিন্ন; তিনি এমন একটি বড় চুক্তিতে ইরানকে বাধ্য করতে চান যা তাঁর রাজনৈতিক ইমেজকে আরও শক্তিশালী করবে।
যদিও ইসরায়েল মনে করে, কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তেহরানকে পরমাণু বা মিসাইল কর্মসূচি থেকে সরানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, ইরানের অবকাঠামোতে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক সামরিক হামলাই একমাত্র পথ। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই কঠোর নীতি ইরানকে নতি স্বীকার করাবে কি না তা এখনও অনিশ্চিত। তবে এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান প্রভাব—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক ভয়াবহ মন্দার আশঙ্কায় দিন গুনছে।

