আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল (SAR) থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (MENA) অর্থনৈতিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক।
‘বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য’ বা এমইএনএএপি (MENAAP) কাঠামোর আওতায় এই পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশ দুটির ভৌগোলিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মানচিত্রে তাদের পরিচয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এল।
কেন এই পরিবর্তন? বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর বেশি নির্ভরশীল। দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এছাড়া জ্বালানি আমদানির জন্য পাকিস্তান পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিতেই দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক বলয়ে দেশ দুটিকে যুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্যে প্রভাব বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলে ভারতের প্রভাব ও আধিপত্য আরও বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত হলো। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’ (SAARC) আরও দুর্বল ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন এই পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত চিত্রেও বিশাল রদবদল এসেছে। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান বাদ পড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি থেকে কমে ১৭০ কোটিতে নেমেছে। এর ফলে এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৬ শতাংশই এখন ভারতের, যা আঞ্চলিক নীতি নির্ধারণে দেশটিকে একক প্রাধান্য দেবে।
ঝুঁকি ও সম্ভাবনা নতুন এই বলয় পাকিস্তানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। ইতিমত্যেই এর সুফল হিসেবে সৌদি আরব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা ৫ বিলিয়ন ডলার আমানতের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এমইএনএ (MENA) অঞ্চলে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় অনেক কম। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বরাদ্দ ছিল ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে এমইএনএ অঞ্চলে ছিল মাত্র ৪.৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে নতুন কাঠামোয় পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে তুলনামূলক কম আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। এছাড়া তেলের দামের ওঠানামা বা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন থেকে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাংকের এই পদক্ষেপ কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-অর্থনৈতিক মানচিত্রের এক বড় বিবর্তন। পাকিস্তান এখন দক্ষিণ এশিয়ার সদস্য হয়েও অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।

