মোঃ মানিক মিয়া,রংপুর (তাজহাট) প্রতিনিধি:
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস আর রাজা-বাদশাদের রাজকীয় আভিজাত্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী তাজহাট জমিদার বাড়ি। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে এবং সোনালী অতীতের স্থাপত্যশৈলী উপভোগ করতে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছেন এই নান্দনিক প্রাসাদে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি রংপুর শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ৫৬ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিশাল এলাকা। ‘ইউ’ (U) আকৃতির এই প্রসাদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে সবুজ ঘাসের মাঠ, সুশৃঙ্খল গাছের সারি এবং দুই পাশে দুটি সুবিশাল পুকুর। উত্তর ও দক্ষিণে কামিনী, মেহগনি ও আম বাগানের ছায়াঘেরা পরিবেশ যে কোনো দর্শনার্থীর মন জুড়িয়ে দেয়।
তাজহাট ও রত্নখচিত মুকুটের ইতিহাস ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাব থেকে আসা মান্নালাল রায়। পেশায় স্বর্ণকার মান্নালাল রায়ের আকর্ষণীয় রত্নখচিত ‘তাজ’ বা মুকুটের কারণেই এই এলাকার নামকরণ করা হয় ‘তাজহাট’। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে পুরোনো প্রাসাদটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বর্তমান এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন মহারাজা কুমার গোপাল রায়।
স্থাপত্যের বিস্ময় দোতলা এই প্রাসাদটির স্থাপত্যশৈলী এক কথায় অতুলনীয়। প্রায় ৭৬ মিটার দীর্ঘ এই প্রাসাদের প্রধান আকর্ষণ হলো সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ১৫ মিটার প্রশস্ত বিশাল কেন্দ্রীয় সিঁড়ি, যা সরাসরি দোতলায় উঠে গেছে। প্রাসাদের ঠিক মাঝখানে ছাদের ওপর আটকোণা বিশিষ্ট ড্রামের ওপর স্থাপিত বিশাল গম্বুজটি দূর থেকেই পথচারীদের নজর কাড়ে। ভবনের নিচতলায় ২৮ মিটারের একটি বিশাল হলঘরসহ মোট ২২টি কক্ষ রয়েছে।
জাদুঘর ও অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ ১৯৯৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০৫ সালে এখানে রংপুর জাদুঘর স্থানান্তর করা হয়। এই জাদুঘরে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।
মুঘল সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়কার হাতে লেখা পবিত্র কুরআন, মহাভারত ও রামায়ণের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। দশম-একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম, কালো পাথরের বিষ্ণু মূর্তি এবং সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় লেখা প্রাচীন হস্তলিপি। মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্বহস্তে লেখা চিঠি এবং সাঁওতালদের ব্যবহৃত প্রাচীন বিভিন্ন সরঞ্জাম।
দর্শনার্থীদের কথা ও স্থানীয়দের দাবি ঘুরতে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, শহরের কোলাহলমুক্ত পরিবেশে ইতিহাস জানার জন্য তাজহাট জমিদার বাড়ি একটি আদর্শ স্থান। তবে অনেক দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জাদুঘরের পাশাপাশি এখানে যদি একটি আধুনিক পিকনিক স্পট ও পর্যটন বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মিশেলে ঘেরা তাজহাট জমিদার বাড়ি বর্তমানে কেবল রংপুরের নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের এক উজ্জ্বল সম্পদ হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।

