মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ, পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও শঙ্কাও।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু দেশে প্রাণহানি ঘটে এবং এর প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে।
সংঘাতের অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে হরমুজ প্রণালি-তে, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এই রুট দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্ব তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
এ অবস্থায় পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। যদিও শুরু থেকেই এই সমঝোতা নড়বড়ে ছিল। বিশেষ করে লেবানন-এ নতুন করে ইসরায়েলি হামলার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত এই কূটনৈতিক বৈঠক। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দুই পক্ষকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর পরই বৈঠকের আয়োজন নিশ্চিত হয়। স্থানীয় সময় শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় সরাসরি মুখোমুখি না হয়ে ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে থাকবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বার্তা আদান-প্রদান করবেন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।
বৈঠককে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ ‘রেড জোন’ এলাকা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত সেরেনা হোটেল ইতোমধ্যে খালি করে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি-তে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আলোচনার মধ্যেই সংঘাত বাড়ার নজির রয়েছে। দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।
সব মিলিয়ে, এই সংলাপ শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। ফলে অনিশ্চয়তার এই সময়ে সত্যিই বলা হচ্ছে—এ মুহূর্তে বিশ্বের সব নজর এখন ইসলামাবাদের দিকেই।

