জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গণিপুর জাফরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন মাহমুদের নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। অভিজ্ঞতার সনদ ও ছাড়পত্র ছাড়াই তিনি চাকরিতে যোগদান করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর প্রাপ্ত সরকারি অংশের বেতন-ভাতা বাবদ ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস। সম্প্রতি জারি করা এক পত্রে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে পত্রে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ দপ্তর এখনো এ পত্রের অনুলিপি পায়নি বলে জানা গেছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক শাহীন মাহমুদ ২০০১ সালের ২৪ মে আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কৃষি) পদে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তিনি ২০১০ সালের ৯ জুলাই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি করেন। এরই প্রেক্ষিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানির ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান শিক্ষকে বলা হয়। ২০১০ সালের ২৭ নভেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির জরুরি সভায় অভিযুক্ত কৃষি শিক্ষক শাহীন মাহমুদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকে শাহীন মাহমুদ কর্মস্থল আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যাননি।
এরপর তিনি ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার গণিপুর জাফর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে পূর্বের প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা সনদ ও ছাড়পত্র ছাড়াই যোগদান করেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, ওই পদে তাঁর যোগদান বিধিসম্মত হয়নি। এ অবস্থায় জেলা শিক্ষা অফিস সিদ্ধান্ত দেয়, সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে তাঁর নিয়োগ অবৈধ হওয়াই ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সরকারি অংশের বেতন-ভাতা ফেরত দিতে হবে। চিঠিতে উল্লেখ করা মোট অর্থের পরিমাণ ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৫০ টাকা, যা সোনালী ব্যাংকের নির্দিষ্ট চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত এ চিঠির অনুলিপি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ কয়েকটি দপ্তরে পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্যরা এখনো চিঠির অনুলিপি পায়নি বলে জানা গেছে।
অভিযুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক দাবি করেছেন, বিষয়টি জেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ হয়েছে। তবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ দাবি নাকচ করে বলেন, এখনো কোনো অর্থ জমা দেওয়া হয়নি এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আক্কেলপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মোমিন বলেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমাকে পত্র দিয়ে তলব করে শাহীন মাহমুদের অভিজ্ঞতা সনদ ও ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চান। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে প্রয়োজনীয় ১০ বছরের অভিজ্ঞতা পূর্ণ হওয়ার আগেই সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় তাঁকে কোনো অভিজ্ঞতা সনদ ও ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এ তথ্য লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে। বেতন ফেরতের পত্রের কোনো অনুলিপি এখনো পাইনি।
সোনালী ব্যাংকের আক্কেলপুর শাখার ব্যবস্থাপক জারজিস আলম বলেন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে গণিপুর জাফর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন মাহমুদের টাকা ফেরত দেওয়ার পত্রের কোন অনুলিপি ব্যাংকে আসেনি। একারণে বিষয়টি জানা নেই।
ওই পত্রের অনুলিপিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রাপকের ঠিকানায় পত্র প্রেরণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাবেদ ইকবাল হাসান বলেন, তিনি এ সংক্রান্ত কোন পত্র পাইনি। পত্র পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিষয়টি জেলা শিক্ষা অফিসের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ হয়েছে বলে অভিযুক্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন মাহমুদ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের ই-মেইলে পত্রটি দেওয়া হয়েছে। আমাকে পত্র নিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর কাছে যেতে বলেছিলেন। ই-মেইলে ও তাঁর কাছে পাঠানো পত্র একই হওয়ায় সেটি নিতে যাইনি। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সঙ্গে বিষয়টি সমঝোতা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন সাংবাদিকদের বলেন, গণিপুর জাফরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহীন মাহমুদের নিয়োগ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে দিয়েছিলেন এলাকাবাসী। অভিযোগ তদন্ত করা হয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে তাঁর নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি। একারণে তাঁকে ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সরকারি অংশের প্রাপ্ত বেতন ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে পত্র দেওয়া হয়েছে। এখনো তিনি টাকা ফেরত দেননি।
পত্রের অনুলিপি না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পত্রে উল্লেখিত সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। হয়তো তারা দ্রুত পেয়ে যাবেন।

