শাওন বেপারী, শরীয়তপুর প্রতিনিধি:
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদী রক্ষাবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের ব্লক তৈরির সাইটে বিএনপি নেতার হুমকি ও এক প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
বুধবার (৮ এপ্রিল) মারধর ও হুমকির একটি ভিডিও ভাইরাল হলে বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগের তীর জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম ফরাজী ও তার অনুসারীদের দিকে।
স্থানীয় সূত্র ও সাইটে কর্মরতদের অভিযোগ, গত ৬ এপ্রিল দুপুরে পূর্বনাওডোবার পৈল্যান মোল্লার কান্দি এলাকায় ব্লক তৈরির সাইটে কয়েকজন সহযোগী নিয়ে প্রবেশ করেন রফিকুল ইসলাম ফরাজী। প্রথমে তারা এফআইডিএল-ভিনসেন জেবি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের আওতায় পরিচালিত বেঙ্গল কনস্ট্রাকশনের সাইটে গিয়ে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধ করে দেন।
এরপর পাশের খুলনা শিপইয়ার্ড কোম্পানির সাইটে গিয়ে কোনো ত্রুটি না পেলেও সেখানে কর্মরতদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং এক প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে তারা হুমকি দেন এই প্রকল্পের সব কাজ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মাধ্যমেই করতে হবে, বাইরের কেউ কাজ করতে পারবে না।
ঘটনার একটি ২ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজে এমন বক্তব্য শোনা গেছে বলে জানা যায়।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে পূর্বনাওডোবা এলাকায় রক্ষাবাঁধ ধসে পড়ায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৩৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। মোট ৩১টি প্যাকেজে ১১টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যার মধ্যে খুলনা শিপইয়ার্ড, এফআইডিএল-ভিনসেন জেবি, এসএস ইঞ্জিনিয়ারিংসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইতোমধ্যে ২টি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে, বাকি কাজ চলমান।
খুলনা শিপইয়ার্ডের অধীনে কাজ করা ত্রিপল এন্টারপ্রাইজের প্রধান প্রকৌশলী এসএম আখতারুজ্জামান জানান, ঘটনার বিষয়ে তিনি তদন্ত করছেন। তার দাবি, সরঞ্জাম সরবরাহকারী সাব-ঠিকাদারের সঙ্গে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও সাব-ঠিকাদার নিয়ামত মাদবরের ভাষ্য, ১০-১৫ জনের একটি দল এসে ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর চড়াও হয় এবং স্থানীয় লোক ছাড়া অন্য কাউকে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেয়। এ সময় ভিডিও ধারণ করায় প্রকৌশলী মেহেদী হাসান রাতুলকে মারধর করা হয়।
ভুক্তভোগী প্রকৌশলী রাতুল বলেন, তারা মালামাল খারাপ বলে অভিযোগ তোলে। আমি বলি, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে মারধর করে, শার্ট ছিঁড়ে ফেলে। পরে নিজেরাই ফেসবুক লাইভে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়।
অন্যদিকে বেঙ্গল কনস্ট্রাকশনের সাইট প্রকৌশলী শাকিল হাসান সোহাগ জানান, নিম্নমানের উপকরণের অভিযোগ তুলে তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং এখনো কাজ বন্ধ রয়েছে। যদিও সাইটে ব্যবহৃত কিছু বালু ও পাথরের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান মাদবর বলেন, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগে কাজ বন্ধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা তাকে জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফরাজী বলেন, নিম্নমানের বালু-পাথর দিয়ে কাজ হচ্ছিল, তাই আমরা কাজ বন্ধ করেছি। তবে প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সামান্য তর্কাতর্কি হয়েছে।
এদিকে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, মারধরের বিষয়টি তার জানা নেই। তবে কোথাও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানি আইনগত ব্যবস্থা নিলে বোর্ড সহযোগিতা করবে।

