সুলতান মাহমুদ, দিনাজপুর :
দিনাজপুরের খানসামার আত্রাই নদীর জিয়া সেতুর সংলগ্ন নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজমি পরিণত হয়েছে সবুজে মোড়া ধানের ক্ষেতে। এই আত্রাই নদীর চরে ভূমিহীন কৃষকরা বোরো ধানের আবাদ করে বুনেছেন সোনালী স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্নের পাশেই ভর করছে শঙ্কা—বন্যার আশঙ্কা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর অধিকাংশ এলাকাজুড়ে দুলছে পাকা ও আধাপাকা ধান। কোথাও শীষ বের হয়েছে, আবার কোথাও শুরু হয়েছে ধান কাটা।
কৃষকদের মতে, আর মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিন সময় পেলেই অধিকাংশ ধান ঘরে তোলা সম্ভব। কিন্তু এরই মধ্যে অকাল বৃষ্টি বা উজান থেকে পানি নেমে এলে মুহূর্তেই ডুবে যেতে পারে সব পরিশ্রম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবছরই শুকনো মৌসুমে আত্রাই নদীর বুকে জেগে ওঠা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়। এতে স্বল্প আয়ের কৃষকদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসে। তবে বর্ষা মৌসুমের আগে ধান ঘরে তুলতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
এদিকে তুলসীপাড়া গ্রামের কৃষকদের চোখে এখন স্বপ্ন আর শঙ্কা পাশাপাশি। সোনালী ধান ঘরে তোলার আশায় দিন গুনছেন তারা। প্রকৃতি সহায় হলে হয়তো নিশ্চিত হবে তাদের অন্তত ছয় মাসের খাদ্য নিরাপত্তা—আর না হলে আবারও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে তাদের কষ্টের ফসল।
খানাসামর আত্রাই নদীর ঢেঁষা তুলসীপাড়ার কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “নদীর চরে অনেক কষ্ট করে ধান লাগাইছি। ধানও ভালো হইছে। আর কিছুদিন সময় পাইলে ঘরে তুলতে পারমু। কিন্তু হঠাৎ পানি আইলে সব শেষ হইয়া যাবে।
একই গ্রামের আরেক চাষি নূর ইসলাম জানান, এই জমি আমাদের নিজের না, নদীর ভেতরের জমি। ঝুঁকি নিয়েই চাষ করি। ধান তুলতে পারলে ছয় মাসের খাবার নিশ্চিত। না পারলে বড় বিপদে পড়মু।
কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “এখন নদীতে পানি নাই বললেই চলে। কিন্তু আগে দেখছি, হঠাৎ বৃষ্টি বা উজানের পানি আইলে একদিনেই নদী ভইরা যায়। তখন এই ধান বাঁচানো যায় না। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি।
জামাল হোসেন নামের আরেক কৃষক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, নিজের জমি নাই। নদীর জমিতেই চাষ করে সংসার চালাই। ধান ভালো হইছে, কিন্তু ভয়ও লাগতেছে। যদি পানি আইসা নষ্ট করে দেয়, তাহলে ধারদেনা কইরা চলতে হইবো।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আফজাল হোসেন বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা নির্বিঘ্নে ধান ঘরে তুলতে পারবেন। তবে অকাল বৃষ্টি বা উজানের পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে ঝুঁকি থেকেই যায়। জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর চরাঞ্চলে প্রতিবছরই ভূমিহীন ও স্বল্প জমির কৃষকরা ইরি-বোরো মৌসুমে আবাদ করে থাকেন। নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা এমনভাবে রোপণ করেন, যাতে বর্ষার আগেই ফসল ঘরে তোলা যায়। তবুও প্রকৃতির অনিশ্চয়তা সব সময়ই তাদের তাড়া করে ফেরে।

