চবি প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান বলেন,
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশ পরিচালনায় এক নতুন গতিশীলতার সূচনা হয়েছে।
উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, নীতিগত সংস্কার এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে একটি আধুনিক, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। বিশেষ করে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে নেওয়া উদ্যোগগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
শিক্ষা খাতে নেতৃত্ব দিতে সরকার দায়িত্ব দিয়েছে -ব ন ম এহসানুল হক মিলন কে, যিনি অতীতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের নজির স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন।
সম্প্রতি শিক্ষা খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ—শিক্ষক সংকট, পাঠদানের মান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি সরকারের বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত উক্তি—“Education is the most powerful weapon which you can use to change the world”—আজও সমান প্রাসঙ্গিক। একইভাবে দার্শনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সমাজের প্রতিফলন হিসেবে দেখেছিলেন। একটি সুষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—সব স্তরেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আধুনিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান নয়; এটি সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশেও শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে মানোন্নয়ন, গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ বাকি। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার অপরিহার্য অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডাটা সায়েন্স ও রোবোটিক্স ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে পরিচালিত করবে। তাই স্মার্ট ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাব এবং অনলাইন শিক্ষার প্রসার জরুরি।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য। কিন্তু এখনো কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বাড়িয়ে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে বেকারত্ব কমানো সম্ভব।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু গবেষণা তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সীমিত। গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাব এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জরুরি।
শিক্ষার মান ও শিক্ষক উন্নয়ন শিক্ষকদের দক্ষতা শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষা বৈষম্য দূরীকরণ গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এ বৈষম্য কমাতে হবে।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এর ভাষায়, একটি শিশু, একটি শিক্ষক, একটি বই এবং একটি কলম পৃথিবী পরিবর্তন করতে পারে।” বাংলাদেশে নারী শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। শিক্ষা বাজেট শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এখনো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। একটি শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে হলে বাজেট বৃদ্ধি অপরিহার্য।
করণীয় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ কারিগরি শিক্ষা উন্নয়ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার
শিক্ষা বৈষম্য দূরীকরণ গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ।
উপসংহার:
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এ দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও গবেষণামুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়—এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। তাই সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

