কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাগ্য বদলে দেওয়ার কথা থাকলেও কুড়িগ্রামের তাইজুল ইসলামের জীবনে তা নিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত বিড়ম্বনা। জিলাপির দাম নিয়ে করা একটি সরল ভিডিও তাঁকে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই খ্যাতির চাপে এখন ঘরছাড়া হতে হয়েছে এই রাজমিস্ত্রির সহকারীকে।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার সরকারপাড়া গ্রামে তাইজুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। এল আকৃতির একটি নড়বড়ে টিনের ঘরে শ্রবণপ্রতিবন্ধী মা-বাবা ও বোনদের নিয়ে তাঁর বসবাস। টিনের চালে ছিদ্র, বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। অথচ এই অভাবী ঘরটিই এখন স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এক ‘অস্থায়ী স্টুডিও’তে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিন শত শত মানুষের আনাগোনা এবং ক্যামেরার প্রশ্নবাণে জর্জরিত তাইজুলের পরিবার। তাঁর এসএসসি পরীক্ষার্থী ছোট বোন সুফিয়া খাতুন আক্ষেপ করে বলে, “ভাই ভাইরাল হইছে ভালো, কিন্তু আমাদের সমস্যা কেউ দেখে না। সারাদিন এত লোক আসে যে আমি পড়তেও পারি না।” ভিড়ের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে তাইজুল এখন বাড়ি ছেড়ে অন্য গ্রামে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছেন।
রোববার দুপুর থেকে তাইজুল ইসলামের জনপ্রিয় ফেসবুক পেজটি আর দেখা যাচ্ছে না। ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে পেজটি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে কেন এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে অনুসারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
তাইজুলের ভিডিওর মূল শক্তি ছিল তাঁর চরের মানুষের সহজ-সরল কণ্ঠস্বর। কিন্তু বর্তমানে কিছু কনটেন্ট নির্মাতা তাঁকে দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা জটিল জাতীয় ইস্যুতে ফরমায়েশি ভিডিও বানাচ্ছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য কবিরুল ইসলামের মতে, এতে তাইজুলের নিজস্বতা নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ভয়, বাজারী কনটেন্টের লোভে পড়ে প্রান্তিক মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলো তুলে ধরার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা যেন হারিয়ে না যায়।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন তাঁর পরিবারকে খাসজমি ও ঘর নির্মাণে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী মা-বাবার জন্য ভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজমিস্ত্রির সহকারী (বর্তমানে অনিশ্চিত)। ভিড়ের চাপে ঘর ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। ফেসবুক পেজ সাময়িকভাবে বন্ধ বা উধাও। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা।
তাইজুল ইসলামের এই গল্পটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ভাইরাল সংস্কৃতি কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে ওলটপালট করে দিতে পারে। তাঁর সহজ-সরল কন্ঠস্বর কি চরের মানুষের দাবি আদায়ের হাতিয়ার হবে, নাকি কেবল ভিউ পাওয়ার সস্তা উপকরণে পরিণত হবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

