জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ হোঁচট খেতে যাচ্ছে। ওই সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত আইনে রূপান্তর না করার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। এর ফলে গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণের মতো স্পর্শকাতর ও মৌলিক সংস্কারগুলো কার্যকারিতা হারাতে বসছে।
গত বৃহস্পতিবার সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে এই সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯৮টি অধ্যাদেশ সরাসরি বিল আকারে এবং ১৫টি সংশোধন সাপেক্ষে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হলেও ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের তালিকায় রাখা হয়েছে।
বাতিলের তালিকায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ
বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলো হলো:
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ: যেখানে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছিল।
বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয়: উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন এবং নিম্ন আদালতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ।
মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ: রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা ও কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিধান।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশ কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
সরকার ও আমলাতন্ত্রের ‘আপত্তি’ বনাম ভিন্নমত
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায় সম্পৃক্ত থাকায় এটি সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া এবং তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার শর্তারোপের কথা বলা হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, আমলাতন্ত্রের পরামর্শে সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো থেকে পিছিয়ে আসছে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি একে সরকারের জন্য ‘আত্মঘাতী’ পদক্ষেপ হিসেবেও অভিহিত করেন।
সংসদে নোট অব ডিসেন্ট ও রাজনৈতিক বিতর্ক
অধ্যাদেশগুলো বাতিলে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তে খোদ সংসদ সদস্যদের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে। কমিটির সদস্য ও বিএনপি নেতা নওশাদ জমির এবং জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা কিছু ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো বাহিনীর জন্য দায়মুক্তির সুযোগ রাখা সংবিধানের লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরাসরি অধ্যাদেশ না করে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে নতুন বিল আকারে আনা ভালো। তবে সমালোচকরা বলছেন, ১০ই এপ্রিলের মধ্যে এগুলো আইনে রূপান্তর না হলে যে আইনি শূন্যতা তৈরি হবে, তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সামনে যা ঘটবে
আগামী সোমবার থেকে অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। মোট ১১৭টি বিল সংসদে উত্থাপন করা হতে পারে। তবে বাতিলের তালিকায় থাকা ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারালে গুমের তদন্ত ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারের প্রক্রিয়াটি পুনরায় আগের অবস্থায় (ভিক্টোরিয়ান বা বিগত সরকারের কাঠামো) ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এক নজরে পরিসংখ্যান:
মোট অধ্যাদেশ: ১৩৩টি
সরাসরি বিল হচ্ছে: ৯৮টি
সংশোধনসহ বিল হচ্ছে: ১৫টি
কার্যকারিতা হারাচ্ছে: ২০টি (এর মধ্যে ৪টি রহিত ও ১৬টি আপাতত স্থগিত)

