মোঃ তৌহিদুর রহমান, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
অ্যাম্বুলেন্স আছে, কিন্তু নেই চালক। রাজবাড়ীর তিনটি সরকারি হাসপাতালে এটাই এখন বাস্তব চিত্র। চালক সংকটে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স গ্যারেজে পড়ে মরিচা ধরছে, আর জরুরি মুহূর্তে রোগীদের স্বজনদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কাছে — তিনগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে। সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষ জানেন, বারবার উপরে জানিয়েছেনও — তবু মেলেনি কোনো সমাধান।
রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল — জেলার সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এখানে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে চারটি, কিন্তু চালক আছেন মাত্র একজন। চালকের পদ দুটি। দুই বছর আগে একজন চালক অবসরে গেছেন, তারপর থেকে একাই সামলাচ্ছেন সব।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তিনটি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের নতুন ভবনরি গ্যারেজে পড়ে আছে। একটির টায়ার সম্পূর্ণ বসে গেছে, গায়ে জমেছে ধুলোবালি। নতুন ভবনের সামনে একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। বোঝা যায় সেটিতেই রোগী পরিবহন করে।
একমাত্র কর্মরত চালক মাসুদ বলেন, “আমি একা সব রোগী বহন করতে পারি না। কোনো রোগী নিয়ে ঢাকা গেলে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ৮ ঘণ্টা লেগে যায়। ফিরে এসেই আবার রোগী বহন সম্ভব হয় না। আগে দুজন চালক ছিলাম, তখন সুবিধা ছিল। এখন একলা হয়ে অনেক সমস্যা হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সগুলোর যন্ত্রপাতি যেন ভালো থাকে, সেজন্য নিয়মিত সেগুলো সরানো করি।
সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, “সদর হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে চারটি, কিন্তু চালকের পদ মাত্র দুটি। একজন অবসরে গেছেন। একজন চালকের পক্ষে চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তিনজন চালক হলে ভালো হতো। বিষয়টি আমি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
একই করুণ চিত্র পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটিমাত্র অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। চালকও ছিলেন একজন। তবে চালক তিন বছর আগে অবসরে যাওয়ার পর থেকে গাড়িটি গ্যারেজেই পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় টায়ার বসে গেছে, সারা গায়ে ধুলোবালি আর মাকড়সার জাল। একনজর দেখলেই বোঝা যায়, সংস্কার ছাড়া এই অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহনের কোনো সুযোগ নেই।
ফলে পাংশা উপজেলার রোগীদের এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর — বাড়তি ভাড়া দিয়ে।
রাজবাড়ী শহরের বেড়াডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত ২০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রেও রয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। ২০২৩ সালে চালক অবসরে যাওয়ার পর থেকে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে গ্যারেজে। যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু নিয়োগ মিলছে না নতুন চালকের।
রাজবাড়ী শহরের বাসিন্দা ফারুক উদ্দিন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “সদর হাসপাতালে জরুরি রোগী এলেই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। আমি অনেকবার রোগী নিয়ে গেছি ফরিদপুরে, কিন্তু কখনো সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সেবা পাইনি। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে ১৮শ থেকে ২ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়, অথচ সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মাত্র ৬৬০ টাকা। এভাবে রোগীরা কতটা সর্বশান্ত হচ্ছে, ভাবা যায়!
স্থানীয় বাসিন্দা নেহাল আহমেদ বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, অথচ চালকের অভাবে সেটি নষ্ট হচ্ছে। আর রোগীদের তিনগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বেসরকারি গাড়িতে যেতে হচ্ছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের অবশ্যই দেখা উচিত।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. মাসুদ বলেন, “শুধু অ্যাম্বুলেন্সের চালক সংকট নয়, এক্স-রে মেশিন রয়েছে কিন্তু এক্স-রে ম্যান নেই — এরকম অনেক সংকট রয়েছে। সবগুলো বিষয়েই আমরা উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও কেবল চালক সংকটে তা অকেজো পড়ে থাকছে — এতে একদিকে জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সরকারি সম্পদ। দ্রুত চালক নিয়োগ দিয়ে এই সংকট সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

