আল আমিন হোসেন, পাংশা (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি:
মাঠে মাঠে এখন সোনালী পেঁয়াজের সমারোহ। যে ফসল ঘরে তুলে হাসিমুখে বছরের খরচ চালানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাজার হাজার কৃষক, সেই পেঁয়াজই এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের বড় একটি অংশ জোগান দিয়ে থাকেন রাজবাড়ী জেলা, সারা দেশে তৃতীয় স্থানে থাকলেও, ন্যায্য দাম না পেয়ে আজ এই অঞ্চলের চাষিদের চোখে জল।
চলতি মৌসুমে রাজবাড়ী জেলাজুড়ে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে সত্য, কিন্তু সেই আনন্দের রঙ ফিকে হয়ে গেছে বাজার দরের নিম্নগতিতে। জেলার পাংশা উপজেলা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালীর হাটগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ কৃষকদের দাবি, বর্তমান বাজারে সার, বীজ, সেচ এবং শ্রমিকের চড়া মূল্যের কারণে এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে অন্তত ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
পাংশা উপজেলার একজন হতাশাগ্রস্ত কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, “বীজের দাম বাড়তি, সারের দাম বাড়তি, জন (শ্রমিক) নিলে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা দেওয়া লাগে। সব মিলায় এক মণ পেঁয়াজ ২ হাজার টাকায় বেচতে না পারলে আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই। এখন ১ হাজার টাকাও দাম পাচ্ছি না, ঘরে তুলবো কীভাবে সেই চিন্তায় মাথায় হাত।”
মাঠে গিয়ে দেখা যায়, অনেক কৃষকই আক্ষেপ নিয়ে পেঁয়াজ তুলছেন। প্রতি বিঘা জমিতে যে পরিমাণ শ্রম ও অর্থ তারা বিনিয়োগ করেছেন, বর্তমান বাজারে তার অর্ধেকও উঠে আসছে না। অনেক চাষি ঋণের টাকা শোধ করার চিন্তায় এখন দিশেহারা। শ্রমিকের মজুরি মেটাতে না পেরে পরিবারের ছোট বড় সবাইকে নিয়ে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারিভাবে যদি দ্রুত বাজার মনিটরিং বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করা হয়, তবে ‘পেঁয়াজ ভাণ্ডার’ হিসেবে খ্যাত রাজবাড়ীর এই পরিশ্রমী কৃষকরা আগামীতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
দেশের চাহিদার বড় জোগানদাতা এই কৃষকদের মুখে হাসি না ফিরলে, তা কেবল রাজবাড়ী নয়, সারা দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্যই এক অশনিসংকেত। এখন কেবল দেখার বিষয়, হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘামে ভেজা এই পেঁয়াজের সঠিক মূল্য পেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ আসে কি না।
এ বছরে রাজবাড়ী জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন। জেলায় ৩৫ হাজার হেক্টর আবাদের মধ্যে পাংশা উপজেলায়ই প্রায় ১০ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের চাষ করা হয়েছে।

