জয়পুরহাট প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটে ভয়াবহ ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। একাধিক কৃষকের অভিযোগ, তারা কোনো ঋণ গ্রহণ না করলেও তাদের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। পরে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় শতাধিক কৃষকের কাছে ঋণ খেলাপির নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
কালাই পৌরশহরের আঁওড়া মহল্লার মৃত আহাদ আলীর ছেলের নুর আলম মন্ডল বলেন, ব্যাংকেই যাইনি। অথচ ঋণখেলাপির লাল নোটিশ এসেছে বাড়িতে। কোথায় ব্যাংক আছে তাও জানিনা। মাঠে এক শতক জমিও নেই আমার, নাম-ঠিকানা ধরে জমির ভূয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে ব্যাংক থেকে ৯-১০ বছর আগে আমার নামে কৃষিঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ সালে অনুমোদন করা হয়েছে সেই ঋণ। এখন পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে লাল নোটিশ পাঠিয়েছে। নোটিশ পেয়ে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েছি। এবং২০ বছর আগে মারা যাওয়া একাধীক ব্যক্তিসহ প্রায় অর্ধশতাধীক পরিবারকে এমন নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের নাম ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৬-২০১৭ সালে বিভিন্ন পরিমাণে ব্যাংক থেকে ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের বাড়ি কালাই পৌরসভার, আঁওড়া মহল্লা ও উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামে।
ঋণবিধি অনুযায়ী ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংকের একজন মাঠ কর্মকর্তা ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির সাথে কথা বলে তাঁর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেন। সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে ঋণের ব্যাপারে সুপারিশ করবেন। ব্যবস্থাপক আবার যাচাই-বাছাই করে ঋণগ্রহীতার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে ঋণ অনুমোদন করেন। কিন্তু এসবের কিছুই না করে ব্যবস্থাপক নিজে এলাকায় দালালদের সাথে যোগাযোগ করে এসব ভূক্তভোগীদের আইডি কার্ড ও ছবি সংগ্রহের পর জমির ভূয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে তাদের নামে প্রায় কোটি টাকারও বেশী ঋণ নিয়ে আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ ভূক্তভোগীদের।
ঋণ তুলে নেওয়ার ৮-৯ বছর পর ব্যাংক থেকে ঋণ পরিশোধের জন্য ভূক্তভোগীদের নামে লাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়ার পর ভুক্তভোগী ও তাঁদের স্বজনরা অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখায় যোগাযোগ করেন। তাঁরা এটিকে ‘লুটপাটের মহোৎসব’ উল্লেখ করে ব্যাপারটি দ্রæত সুরাহা করার দাবি জানিয়েছেন। ব্যাংকটির বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ গত ২০১৬-২০১৭ সালে কর্মরত শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম ও দুইজন ফিল্ড সুপারভাইজারকে এসব ভূয়া ঋণের বিষয়ে তলব করার কথা জানিয়েছেন। এসব ঘটনা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তৎকালিন শাখা ব্যবস্থাপকের অবসরকালিন সকল সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক। তৎকালিন ফিল্ড সুপারভাইজার দুইজন অন্য শাখায় কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালাম জানান, ততকালিন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম অফিস সময়ের পর জোরপূর্বক চাকরির ভয় দেখিয়ে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছেন। চাকরি হারানোর ভয়ে আমরা ওই সময় এসব ভূয়া ঋণের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি। তবে কার নামে কত ঋণ নিয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণের সীট অনুযায়ী, কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, আহম্মেদাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর গ্রামে ৩৮ জন, হারুঞ্জা গ্রামে ৩৩ জনের নামে ওই শাখা থেকে বিভিন্ন পরিমানে কৃষিঋণ উত্তোলণ দেখানো হয়েছে। যাঁদের নামে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার মৃত জনাব আলী মোল্ল্যার ছেলে মৃত আব্দুর রাজ্জাক হোসেন মোল্ল্যা ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। অথচ তাঁর নামে ২০১৬ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে সুদ আসলে ৯৯ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে ভূক্তভোগী পরিবারকে।
মৃত আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যার ছেলে সোহেল মোল্ল্যা বলেন, আমার বাবা মারা গেছে ১৫ বছর আগে। জীবিত থাকা অবস্থায় বাবার নামে কৃষি ঋণ ছিল, বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় সেই ঋণ পরিশোধও করেছেন। হঠাৎ করে বাবার নামে ঋণ পরিশোধের লাল নোটিশ এসেছে। বাবা নাকি ২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। তাহলে কি আমার বাবা কবর থেকে ওঠে এসে ওই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন ? এটা অসম্ভব, এভাবেই দেশে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। ব্যবস্থাপকের কঠিন শাস্তির দাবি জানান তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা বাহিরপাড়া গ্রামের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে ফজলুর রহমানের। তার বাবাও গত ১৮ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। অথচ ২০১৬ সালে আমন চাষের উপর ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। যা সুদ-আসলে ৯৯ হাজার টাকা পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশ পেয়ে পুরো পরিবার হতভম্ব।
আঁওড়া মহল্লার ভ্যান চালক পুতুল চন্দ্র বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁদে পড়ে। সংসারে প্রচুর অভাব দেখা দেয়। একটি ভ্যান কিনতে টাকার জন্য সবার দাড়ে দাড়ে ঘুরেছি, কারও কাছে টাকা পাইনি। তখন ঋণের জন্য কালাই অগ্রণী ব্যাংকের দালাল একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদের কাছে যাই। সে বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলে ৫ হাজার টাকাসহ আইডি কার্ড ও ছবি দিতে হবে। তার কথাতে রাজি হয়ে ২ হাজার টাকা, আইডি কার্ডের ফটোকপি ও দুইকপি ছবি দেই তার কাছে। ১৫দিন পর টাকা, আইডি কার্ড ও ছবি ফেরত দিয়ে বলে আপাতত ঋণ দেওয়া বন্ধ আছে। এখন দেখছি আমার নামে ২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। সুদ-আসলে সেই টাকার পরিমান দাড়িয়েছে ৯৯ হাজার ২’শ টাকা।
আঁওড়া মহল্লার জাহানারা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজে বুয়ার কাজ করেন। তাঁর নামে কালাই শাখা থেকে ৩৫ হাজার ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। একই গ্রামের খাজাউল ইসলামের নামে ৪৫ হাজার টাকার, শরাফত আলীর নামে ৫০ হাজার টাকার ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। এভাবে গ্রামের কমপক্ষে ১৬ জনের নামে বিভিন্ন পরিমানে ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী জাহানারা বেগম জানান, তিনি কোনো দিন ওই ব্যাংকে যাননি এবং ঋণও নেননি। অথচ তাঁর নামে ২০১৭ সালে ঋণ তোলা হয়েছে। ব্যাংক থেকে চিঠি পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর কয়েক দফায় ব্যাংকে গিয়ে যোগাযোগ করেছেন। সেখানে দেখেন, ঠিকানা ও ছবি ঠিক থাকলেও স্বাক্ষর তাঁর না।
অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার দালাল আঁওড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, এলাকার যে কোনো ব্যক্তির আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিলেই ম্যানেজার আমাকে দুই হাজার টাকা করে দিত। আইডি কার্ড ও ছবি নিয়ে তিনি কি করতেন তা আমার জানা নেই। আমি কমপক্ষে ৬০-৭০ জনের আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিয়েছি। এখন শুনছি তাদের নামে ঋণ তুলে নিয়েছে ম্যানেজার নূরুল ইসলাম। অভাবের কারনে আমি এই কাজ করেছি।
অগ্রণী ব্যাংকের কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের বেশ কয়েকজন কার্যালয়ে এসে তাঁকে বিষয়টি অবগত করেছেন। এরপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ঋণগুলো ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছে। সেই সময় যিনি ব্যবস্থাপক ছিলেন, তিনি অবসরে গেছেন। এ বিষয়ে উদ্ধতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছেন। বেশ কয়েকজনের ঋণ জালিয়াতির বিষয় সনাক্তও করেছেন। কর্তৃপক্ষ ওই ব্যবস্থাপকের অবসরকালিন সকল সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রেখেছেন। বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।
তৎকালিন অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম বলেন, চাকরি থেকে অবসরে আসছি, বয়স অনেক হয়েছে। এত আগের বিষয় কি আর আমার মনে আছে। বাদ দেন এসব কথা, নিউজটি বন্ধ রাখতে কি করতে হবে তাই বলেন। যা ঘটেছে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর আমার বিষয়।
অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক মো. জুলফিকার আলী বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। কিছু ক্রুটিবিচ্যুতি ইতমধ্যে সনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই তার প্রাপ্ত পেনশনের অর্থ থেকে জালিয়াতি করে অন্যর নামে ঋণ নেওয়া অর্থ সমন্বয় করা হবে। মুলত এই কারনেই ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সকল সুযোগ সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে।

