মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারের নজর চলে যায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র দিকে। তবে এই উত্তেজনা কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচেই সীমাবদ্ধ থাকে না—এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আপনার ঘরের বিদ্যুৎ বিলে। প্রশ্ন জাগতে পারে, হাজার মাইল দূরের এক জলপথের অস্থিরতা কীভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলবে?
বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জ্বালানি আমদানির ওপর আমাদের উচ্চ নির্ভরশীলতা। মূলত চারটি প্রধান কারণে এই সংকট ঘনীভূত হতে পারে:
১. বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ তেল ও এলএনজি (LNG) ভিত্তিক। হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত বোঝা এসে পড়ে সাধারণ গ্রাহকের কাঁধে।
২. এলএনজি সরবরাহে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে। এই জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট হলো হরমুজ প্রণালি। এই পথে চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তখন বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করে বা চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে হয়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ব্যয়বহুল করে তোলে।
৩. সরকারি ভর্তুকির সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার সাধারণত বড় অংকের ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই বিশাল ভর্তুকির চাপ আর টেকসই থাকে না। তখন বাধ্য হয়েই সরকারকে গ্রাহক পর্যায়ে দাম সমন্বয় বা বৃদ্ধি করতে হয়।
৪. পরোক্ষ প্রভাব ও মূল্যস্ফীতি
জ্বালানির দাম বাড়লে কেবল সরাসরি বিদ্যুৎ বিল নয়, বরং পণ্য পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুৎ খাতের রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন সংযোগের খরচকেও প্রভাবিত করে।
আশঙ্কা কতটা বাস্তব? জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদী উত্তেজনা হয়তো বাংলাদেশের বাজারে বড় কোনো ধাক্কা দেবে না। তবে এই সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্বজুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি হবে তার ঢেউ ধাপে ধাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আছড়ে পড়া প্রায় নিশ্চিত। তাই মধ্যপ্রাচ্যের এই জলপথের শান্ত থাকা কেবল বিশ্বশান্তি নয়, আপনার মাসিক খরচের হিসাব ঠিক রাখার জন্যও জরুরি।

