সৈয়দ আমিরুজ্জামান
একটা সময় ছিল, যখন স্যাটেলাইট টিভির ঝলমলে পৃথিবী আমাদের জীবনে ঢোকেনি। বিটিভির সীমিত সম্প্রচারের দিনগুলোতে রাত আটটার সংবাদের আগে প্রচারিত হতো একটি গান— “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না…”। গানটি শুধু একটি সংগীত ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের মানসিক প্রস্তুতি, এক ধরনের বোধের দরজা খোলার আহ্বান। সেই আহ্বান আজও প্রাসঙ্গিক, হয়তো আগের চেয়েও বেশি।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার দিন। কিন্তু এই দিনের ঠিক আগের রাত—২৫ মার্চ—বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াল কালরাত। সেই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চালায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, পুরান ঢাকা—সব জায়গায় আগুন, গুলি, আর মানুষের আর্তনাদে রাত ভারী হয়ে উঠেছিল। মানুষ তখন বুঝে গিয়েছিল, আর পেছনে ফেরার পথ নেই; স্বাধীনতা এখন শুধু দাবি নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। এত বছর পর আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে অনেক কিছু পেয়েছি—নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, ভাষা, সংস্কৃতির স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যিই অনুভব করতে পারি সেই সময়ের ভয়, অনিশ্চয়তা আর স্বপ্নের মিশ্র অনুভূতি? আমরা কি বুঝতে পারি, একটি দেশের জন্ম কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি ছিল মানুষের অসীম ত্যাগ, নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফল?
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাখো মানুষ শহীদ হয়েছেন, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কোটি মানুষ শরণার্থী হয়েছেন। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সময় মানুষ জানত না তারা বাঁচবে কি না, দেশ স্বাধীন হবে কি না, ভবিষ্যৎ কেমন হবে। তবু তারা লড়েছে। কারণ তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল সম্মান, ভাষা, পরিচয় এবং নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার।
স্বাধীনতা আসার পর ৫৫ বছরে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে—অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার চেতনা শুধু উন্নয়ন পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার আসল চেতনা হলো ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিকতা, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই ১৯৭১ দেখেনি, যুদ্ধ দেখেনি, শরণার্থী জীবন দেখেনি। তাদের কাছে স্বাধীনতা একটি ছুটির দিন, একটি অনুষ্ঠান, একটি প্যারেড বা একটি ফেসবুক পোস্ট হয়ে গেলে সেটি হবে আমাদের ব্যর্থতা। স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে শুধু বইয়ে নয়, অনুভবে, গল্পে, চলচ্চিত্রে, পরিবারে, সমাজে জীবন্ত করে তুলতে হবে।
“সব ক’টা জানালা খুলে দাও”—এই কথাটির অর্থ আজ নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের বোধের জানালা খুলতে হবে, ইতিহাসের জানালা খুলতে হবে, বিবেকের জানালা খুলতে হবে। স্বাধীনতা শুধু অতীতের গৌরব নয়; এটি বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে স্বাধীনতার অর্থ খুঁজে নিতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়—আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশের দিকে এগোচ্ছি, যার স্বপ্ন ১৯৭১ সালে মানুষ দেখেছিল? আমরা কি এমন একটি দেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে অন্যায় কমবে, মানুষ সমান সুযোগ পাবে, এবং মানবিকতা সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে?
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে তাই আবারও মনে হয়—
হয়তো আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, আমাদের বোধের সব ক’টা জানালা খুলে দেওয়া।
তাহলেই আমরা সত্যিকারের স্বাধীনতার অর্থ বুঝতে পারব।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তি শুধু একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক নয়; এটি আত্মসমালোচনা, মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৭১ সালে যে স্বাধীনতার জন্য এ দেশের মানুষ জীবন দিয়েছে, ঘরবাড়ি হারিয়েছে, নির্যাতন সহ্য করেছে—সেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী, ৫৫ বছর পর দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন আবার নতুন করে সামনে আসে। স্বাধীনতা শুধু একটি পতাকা, মানচিত্র বা জাতীয় সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতা মানে মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ, নিরাপদ জীবন এবং শোষণমুক্ত সমাজ।
১৯৭১ সালে মানুষ যুদ্ধ করেছিল শুধু পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। তারা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে, শ্রমিক তার পরিশ্রমের সম্মান পাবে, শিক্ষিত তরুণ বেকার থাকবে না, মানুষ বিচার পাবে, দুর্নীতি কমবে এবং রাষ্ট্র হবে মানুষের জন্য। সেই স্বপ্ন ছিল একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ।
৫৫ বছরে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েছে—এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থনীতি বড় হয়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি হয়েছে, নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে। গ্রাম পর্যন্ত সড়ক গেছে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এখন আর অচেনা দেশ নয়; উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে এসেছে।
কিন্তু উন্নয়ন আর ন্যায়বিচার এক জিনিস নয়। উন্নয়ন আর সমতা এক জিনিস নয়। উন্নয়ন আর মানবিকতা এক জিনিস নয়। এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশ শুধু জিডিপি দিয়ে বড় হয় না, মানুষ দিয়ে বড় হয়। মানুষের জীবনের মান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ—এসব দিয়েই একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন বিচার করা হয়।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো বৈষম্য। একদিকে আকাশচুম্বী ভবন, বিলাসবহুল জীবন, বিদেশে অর্থ পাচার, অন্যদিকে বস্তি, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, কৃষকের লোকসান, শ্রমিকের কম মজুরি। একই দেশে কেউ হাজার কোটি টাকার মালিক, আবার কেউ দিনে দুইবেলা খেতে পারে না। এই বৈষম্য স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে যায় না।
জনগণের বড় প্রত্যাশা ছিল—একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো দুর্নীতি এখনো বড় সমস্যা। প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা, উন্নয়ন প্রকল্প—সব জায়গায় দুর্নীতির কথা মানুষ আলোচনা করে। দুর্নীতির কারণে উন্নয়নের সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। জনগণের কষ্টের টাকায় তৈরি প্রকল্প যদি দুর্নীতিতে নষ্ট হয়, তাহলে উন্নয়ন সংখ্যায় বাড়লেও মানুষের জীবনে তার প্রভাব কম পড়ে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বেকারত্ব, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারত্ব। প্রতি বছর অসংখ্য তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে, কিন্তু সবার জন্য কাজ নেই। অনেকেই বিদেশে যেতে চায়, কারণ দেশে সুযোগ কম। একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। যদি তারা হতাশ হয়, তাহলে সেটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।
কৃষি এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, কিন্তু কৃষক সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। কখনো ফসলের দাম পায় না, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়, কখনো উৎপাদন খরচ বেশি হয়। কৃষক যদি বাঁচে না, তাহলে দেশও শক্তিশালী হতে পারে না।
শ্রমিকরা দেশের শিল্প ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা এখনো কঠিন। কম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সমস্যা, বাসস্থান সমস্যা—এসব এখনো বড় বাস্তবতা। স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে শ্রমিক ও কৃষকের জীবনমান উন্নত করা সবচেয়ে জরুরি।
গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ যদি ভয় ছাড়া কথা বলতে না পারে, মতামত দিতে না পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারে—তাহলে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ভিন্নমতকে সম্মান করা হয় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস ও চেতনা জানানো। শুধু বইয়ের মধ্যে ইতিহাস থাকলে হবে না; পরিবারে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে—সব জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও মানুষের ত্যাগ তুলে ধরতে হবে। নতুন প্রজন্ম যদি স্বাধীনতার মূল্য না বোঝে, তাহলে ভবিষ্যতে স্বাধীনতার চেতনা দুর্বল হয়ে যাবে।
আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
আমরা কি শুধু বড় বড় সেতু, রাস্তা আর ভবন চাই, নাকি ন্যায়বিচার, সমতা, মানবিকতা ও নিরাপত্তা চাই?
আমরা কি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাই, নাকি একটি মানবিক রাষ্ট্র চাই?
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মানুষ মানুষকে সম্মান করবে, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পাবে?
স্বাধীনতা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ন্যায়বিচারের স্বাধীনতা এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি—এমন মনে করেন অনেক মানুষ। তাই স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি; এটি এখনো চলছে অন্য রূপে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।
“সব ক’টা জানালা খুলে দাও”—এই কথাটির আজ নতুন অর্থ আছে।
আমাদের চিন্তার জানালা খুলতে হবে, সমালোচনার জানালা খুলতে হবে, সত্য বলার জানালা খুলতে হবে, ইতিহাস জানার জানালা খুলতে হবে।
রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির সব জায়গায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে জনগণের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা খুব জটিল কিছু নয়।
মানুষ চায়—
ন্যায্য আয়, নিরাপদ জীবন, ভালো চিকিৎসা,
মানসম্মত শিক্ষা, বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন,
এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।
এই সাধারণ চাওয়াগুলোই আসলে স্বাধীনতার প্রকৃত চাওয়া।
স্বাধীনতার এত বছর পর আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—দেশকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, নৈতিকভাবে, মানবিকভাবে ও গণতান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী করা। কারণ একটি দেশের আসল শক্তি তার অর্থনীতি নয়, তার মানুষ, তার ন্যায়বিচার, তার মানবিকতা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে তাই আবারও বলা যায়—
স্বাধীনতা শুধু অতীতের গৌরব নয়, এটি বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
আর সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে সত্যিই আমাদের বোধের সব ক’টা জানালা খুলে দিতে হবে।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com

