শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ সোহাগ ওরফে জিম সোহাগের স্ত্রী দুই সন্তানের জননী শামীমার (২৩) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বেলা ৩ টায় সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে সুরতহাল তদন্তের পর থানায় নেয়া হয়েছে লাশ।
এর আগে সকাল ১১ টার বেশি দিকে শহরের গোলাহাট রেলওয়ে কলোনীর নিজ বাড়ি থেকে লাশ হাসপাতালে আনা হয়। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও সোহাগের পরিবারের লোকজনের লুকোচুরি আচরণ নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং হত্যা না আত্মহত্যা তা ঘিরে শহরজুড়ে নানা গুঞ্জন দেখা দিয়েছে।
খবর পেয়ে বেলা সাড়ে ১২ টায় সংবাদকর্মীরা সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে গেলে মর্গের সামনে অবস্থানরত নিহতের বিমাতা ৩ বোন, ছোট জা ও বড় ননদকে দেখা যায়। কিন্তু তারা সংবাদকর্মীদের কোন তথ্য দিতে অপারগতা জানান। এসময় সোহাগের বড় বোন ক্ষিপ্ত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, সকাল ১১ টার দিকে নিহত শামীমার ছোট জা মনি লাশ হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁস দেয়া অবস্থা থেকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে? তবে, মনিও এবিষয়ে কথা বলতে অসম্মতি জানান।
এলাকাবাসী অনেকে জানান, শামীমাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। পরে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে। সেই সাথে প্রশাসনকেও ম্যানেজ করা হয়েছে। যাতে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা হয়। যে কারণে হাসপাতাল থেকে একাধিকবার জানানোর পরও ঘটনার ৩ ঘন্টায়ও পুলিশ হাসপাতালে আসেনি।
পরে হাসপাতালের আরএমও বিষয়টি সার্কেল এসপি কে জানালে পুলিশ উদ্যোগী হয়। তারপরও দীর্ঘ ৩ ঘন্টা পার হয়। এসময়ে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য সোহাগের বোন নানাভাবে চেষ্টা চালায়। বিভিন্নজনকে দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশকে চাপ দেয়। এমনকি ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীও আসেন।
তারা আরও জানান, শেখ সোহাগদের স্থায়ী ঠিকানা হলো বাগেরহাট জেলা। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় চাকুরির সুবাদে তার বাবা শেখ হোসেন এখানে আসেন। তিনি (বাবা) অবসরে গেলে গোলাহাট রেলওয়ে কলোনীর বেশ কয়েকটি কোয়াটার দখল করে তারা পুরো পরিবার বসবাস করছেন।
আর শামীমার বাড়ি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ শহরের টিএন্ডটি রোড, মেলাগাজী এলাকায়। সেখানকার মৃত. হোসেন আলীর দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে শামীমা। ৭ বছর আগে সোহাগের সাথে তার বিয়ে হয়েছে। তাদের ৬ বছর ও ২ বছর বয়সের দুটি ছেলে আছে।
একটি সূত্র জানায়, নিহত শামীমার স্বামী শেখ সোহাগ ৫ আগস্টের পর সৈয়দপুর থানায় করা দুইটি মামলার আসামী। একারণে সে দীর্ঘদিন থেকে পলাতক। তবে গত কয়েকদিন আগে সে সৈয়দপুরে এসেছে। আসার পর থেকেই সে স্ত্রীর উপর নির্যাতন করে চলেছে।
চব্বিশের আন্দোলনের সময় সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপি’র অফিসে হামলা, ভাঙ্চুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মুল হোতা এই সোহাগ। যে, আওয়ামী আমলে সৈয়দপুরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।
সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ডা. জাকিয়া সুলতানা জানান, সকাল ১১ টায় রোগীকে মৃত অবস্থায় তার ছোট জা মনি হাসপাতালে এনেছেন। মনি জানান, লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। সেখান থেকে নামিয়ে হাসপাতালে আনা হয়েছে। আমরা পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বিষয়টি আইনী হওয়ায় পুলিশকে অবগত করেছি। পুলিশ আসলেই সিদ্ধান্ত নিবে পোস মর্টেম হবে কি না।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নাজমুল হুদা বলেন, পুলিশকে জানানোর ৩ ঘন্টা হলেও এখনও কেউ আসেনি। সৈয়দপুর থানার ওসি হাসপাতাল থেকে লিখিত চান, তারপর ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। এর প্রেক্ষিতে সৈয়দপুর সার্কেলের এসপি কে জানালে তিনি ব্যবস্থা নেন। শেষে পুলিশ এসে সুরতহাল তদন্ত করেছেন।
সৈয়দপুর থানার এসআই একরামুল হকের নেতৃত্বে পুলিশ বেলা আড়াইটায় হাসপাতালের মর্গে লাশের সুরতহাল তদন্ত করেন। তাকে সহযোগিতা করেন এসআই আব্দুল হামিদ। তারা জানান, নিহতের পরিবারের লোকজন আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে লাশের ময়নাতদন্ত হবে কি না। কারণ উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনরা লাশ থানায় নিতে বাধা দিচ্ছে।
সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল করিম রেজা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিত না দেওয়ায় হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়নি।তাছাড়া নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকেও কোন অভিযোগ দেয়া হয়নি। পরে উর্ধতন কর্মকর্তার নির্দেশে পুলিশ গেছে এবং সুরতহাল তদন্ত করেছে।
একটি সূত্র মতে, লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে এবং গলা বরাবর ঘাড়েও কালচে দাগ দেখা গেছে। আর মত্যুর সময় গত রাতেই হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে সুরতহালকালে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। যা ময়না তদন্ত হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে দাবি সূত্রটির।
তবে সোহাগের পরিবারের পক্ষে একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়, মূলত শামীমা আত্মহত্যা করেছে। ঈদের কাপড় কেনা নিয়ে বাক বিতন্ডা হওয়ায় অভিমান করেই ঘরের সিলিংয়ের সাথে সে গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁস লাগিয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে পুলিশী ঝামেলার ভয়ে সোহাগ ও তার বাবা গা ঢাকা দিয়েছে।

