পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দুই সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের প্রায় দুই হাজার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে এই অঞ্চলের আটটি দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে সমুদ্রপথে ৮১ শতাংশ পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ হাজার ৮২৩টি প্রতিষ্ঠান এই বাজারে পণ্য পাঠালেও ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা এখন হুমকির মুখে। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠানের মোট রপ্তানির ৫০ থেকে ১০০ শতাংশই যায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে। বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক এই সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
১. খাদ্য ও কৃষিপণ্য: মসলা, বিস্কুট ও পানীয় খাতের রপ্তানি এই অঞ্চলে প্রায় ১০ কোটি ডলারের। যুদ্ধের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক কারখানায় অস্থায়ী কর্মীদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
২. সবজি ও পানপাতা: প্রায় ৩ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হয় এই বাজারে। বিমানপথে জেদ্দা ও মদিনায় সীমিত পরিসরে পণ্য পাঠানো গেলেও পরিবহন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। কেজি প্রতি ভাড়া ১০৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
৩. পাটজাত পণ্য: পাট সুতা ও কার্পেটের সুতার বড় বাজার ইরান ও তুরস্ক। জাহাজ ভাড়া ২ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৫০০ ডলারে ঠেকায় রপ্তানি প্রায় বন্ধ। ফলে নারায়ণগঞ্জ ও খুলনার পাটকলগুলোতে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৪. তৈরি পোশাক: ১ হাজার ১৪১টি প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলে ৪১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের পুরো বাজারই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সামনের মাসের শিপমেন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে প্রতি কনটেইনারের ভাড়া ২ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে সমুদ্রপথে পণ্য পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান বাজার ছিল। প্রবাসীদের পাশাপাশি স্থানীয় ভোক্তাদের কাছেও বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বাড়ছিল। যুদ্ধের এই ধাক্কা বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।”
উদ্যোক্তারা আশা করছেন, দ্রুত সংঘাত নিরসন না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তারা এখন বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা করছেন, তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে তা-ও সহজ হচ্ছে না।

