ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং দেশটির খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকে নিজের শাসনামলের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এখন ইরান ও কিউবার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযান এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশ্ব পরিস্থিতির জটিলতা ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের রণকৌশল ও তেলের বাজার
ট্রাম্পের বিশ্বাস, জয়কে তিনি যেভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন, দিনশেষে বিশ্ব সেভাবেই তাকে বিজয়ী হিসেবে দেখবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সত্ত্বেও তিনি তার অবস্থানে অনড়। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে। তার মতে, বিশ্বশান্তির জন্য এই সাময়িক অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া ‘সামান্য’ বিষয়।
আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আমেরিকার তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল ৪৮ শতাংশ, যা বর্তমানে ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া বা কাতারের গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইউরোপ বিপাকে পড়লেও আমেরিকার অর্থনীতিতে এর প্রভাব তুলনামূলক কম।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ: মুদ্রাস্ফীতি ও জনরোষ
ট্রাম্পের এই সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। ইরানে মার্কিন হামলা দেশটির সাধারণ জনগণের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয়। যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে আমেরিকায় পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি ৩.৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ট্রাম্পের মেয়াদে সর্বোচ্চ। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই দাম ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। জ্বালানির এই ঊর্ধ্বগতি কৃষি পণ্য ও বিমান ভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে ফেব্রুয়ারি মাসে মুদ্রাস্ফীতি ২.৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছে:
রুশ তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর পথ খোঁজা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজগুলোকে বীমা ও নিরাপত্তা দেওয়া।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তিন দশকের মধ্যে তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে। ওয়াশিংটনের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় যুদ্ধ বন্ধ করা, নয়তো ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা।
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের শঙ্কা
ট্রাম্প তেহরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আশা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আকাশপথে বোমা বর্ষণ করে অবকাঠামো ধ্বংস করা গেলেও হাজার হাজার সশস্ত্র বিপ্লবী গার্ড এখনো পাল্টা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। ট্রাম্পের সামনে এখন স্থলবাহিনী মোতায়েন অথবা কৌশলগত পিছুটান—এই দুই কঠিন বিকল্প টিকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে আটক করা যতটা সহজ ছিল, ইরানের ক্ষেত্রে সেই একই কৌশল সফল নাও হতে পারে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হলে ট্রাম্পের এই ‘বিজয়’ শেষ পর্যন্ত পরাজয়েও রূপ নিতে পারে।

