আবু হাসনাত তুহিন:
গণতন্ত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও আইন প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগ কতটা থাকা উচিত এবং দলীয় শৃঙ্খলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বিতর্ক সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রিত বাংলাদেশ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ-কে ঘিরে। এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে সংসদে স্বাধীন মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক গবেষক ও বিশ্লেষক মনে করেন যে এই অনুচ্ছেদের সংস্কার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এই প্রবন্ধে ৭০ অনুচ্ছেদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রভাব এবং সম্ভাব্য সংস্কার নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
৭০ অনুচ্ছেদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধান-এ সংসদীয় গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলভাঙন, দলত্যাগ এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা ছিল যথেষ্ট প্রবল।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় বিভক্তি ও সংসদ সদস্যদের দলত্যাগের ঘটনা সরকার পরিচালনায় বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেন।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যদি—
ক) নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, অথবা
খ) সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে অবস্থান নেন,
তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হতে পারে।
এর মাধ্যমে মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সরকারকে দলীয় বিদ্রোহের কারণে পতনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়াও এর সাথে নৈতিকতা ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ চর্চার সাথে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে ৭০ অনুচ্ছেদ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলে সংসদে দলত্যাগের ঘটনা প্রায় অনুপস্থিত এবং সরকার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এই অনুচ্ছেদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রথমত, এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগকে সংকুচিত করে। সংসদ সদস্যরা অনেক সময় নিজস্ব মতামত থাকা সত্ত্বেও দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে বা বক্তব্য রাখতে পারেন না।
এছাড়াও স্বাধীনভাবে সংসদে উপস্থিত থাকা, অনুপস্থিত থাকা কিংবা উপস্থিত থেকে ভোট প্রদানে বিরত থাকা ইত্যাদি সব গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। একজন সংসদ সদস্যকে নামমাত্র দলের পুতুলে পরিণত করা হয়েছে। ফলে সংসদে নীতিগত প্রশ্নে স্বাধীন ও প্রাণবন্ত বিতর্কের সুযোগ কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, সংসদ অনেক ক্ষেত্রে কার্যত দলীয় সিদ্ধান্ত অনুমোদনের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। সংসদের মূল উদ্দেশ্য হলো আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণে গভীর আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কিন্তু যখন সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন না, তখন এই প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, জনগণের প্রতিনিধিত্বের ধারণাটিও কিছুটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। সংসদ সদস্যরা মূলত জনগণের প্রতিনিধি হলেও বাস্তবে তারা অনেক সময় দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতিনিধিতে পরিণত হন। অর্থাৎ জনকল্যাণই যে সর্বোচ্চ আইন সেই বিষয়টি দলীয় স্থিতিশীলতার কাছে উপেক্ষিত হয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের নীতিগত প্রশ্ন
সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় শৃঙ্খলা এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা – এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা খুবই জরুরি। দলীয় শৃঙ্খলা না থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সংসদ সদস্যরা যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে দলত্যাগ বা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে শুরু করে, তাহলে সরকার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যায়।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত কঠোর দলীয় নিয়ন্ত্রণ গণতান্ত্রিক চর্চাকে সীমিত করে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে সংসদে নীতিগত আলোচনার গভীরতা কমে যায় এবং গণতন্ত্রের অংশগ্রহণমূলক চরিত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ৭০ অনুচ্ছেদ দলীয় নিয়ন্ত্রণকে অত্যধিক শক্তিশালী করে তুলেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। আসলে, সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই জরুরি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের অনেক সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। যেমন যুক্তরাজ্যের সংসদীয় ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলীয় “হুইপ” জারি করা হয়, তবে সব বিল বা নীতিগত বিষয়ে তা বাধ্যতামূলক নয়। অনেক সময় সংসদ সদস্যরা নিজেদের বিবেচনায় ভোট দিতে পারেন।
ভারতেও দলত্যাগবিরোধী আইন রয়েছে, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের মত প্রকাশের সুযোগ থাকে। ফলে সংসদে আলোচনার মান উন্নত হয় এবং নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও অংশগ্রহণমূলক হয়।
এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেও সংসদ সদস্যদের কিছু মাত্রায় স্বাধীনতা দেওয়া সম্ভব।
সম্ভাব্য সংস্কারের দিকনির্দেশনা
বাংলাদেশে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে। প্রথম প্রস্তাব হলো এই অনুচ্ছেদের প্রয়োগ সীমিত করা। উদাহরণস্বরূপ, কেবলমাত্র সরকার পতনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে এমন ভোট যেমন অনাস্থা প্রস্তাব বা বাজেট এসব ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক রাখা যেতে পারে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব হলো সংসদ সদস্যদের সাধারণ আইন বা নীতিগত বিষয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এতে সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ উন্নত হবে।
তৃতীয়ত, সংসদীয় কমিটিগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। সংসদীয় কমিটিগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম হলে নীতিগত আলোচনায় বাস্তবসম্মত মতামত উঠে আসতে পারে।
সবশেষ, আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো সকল ক্ষেত্রে দলীয় মোট সংসদ সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ৭০ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত দুটি বিষয়ের বিপরীতে অবস্থান নেয়ার বিধান রাখা। এতে করে সংসদীয় ভারসাম্যের নতুন দ্বার খুলবে যার মূল উদ্দেশ্যই হবে জনকল্যাণ সাধন। পাশাপাশি দলীয় স্থিতিশীলতা একেবারেই নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
এই ধরনের সংস্কারকে বিবেচনায় নিলে সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সহায়তা করতে পারে।
সংস্কারের সম্ভাব্য প্রভাব
যদি ৭০ অনুচ্ছেদে সীমিত সংস্কার আনা হয়, তাহলে কয়েকটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। আসলে, এটা খুব সহজ ব্যাপার না।
প্রথমত, সংসদ সদস্যরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকার জনগণের স্বার্থ আরও স্বাধীনভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন। নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে কোনো ভয় ছাড়াই।
দ্বিতীয়ত, সংসদে নীতিগত বিতর্ক ও সমালোচনার মান উন্নত হবে। ফলে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হতে পারে।
তৃতীয়ত, সংসদের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পেতে পারে। দেখুন, জনগণ যখন দেখবে যে সংসদে সত্যিকারের আলোচনা ও মতবিনিময় হচ্ছে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭০ অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আসলে, এটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দলত্যাগের প্রবণতা রোধে কার্যকর ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদকে আরও কার্যকর ও প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। সম্পূর্ণ বিলুপ্তির পরিবর্তে বিচক্ষণ ও সীমিত সংস্কার সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে।
এই ভারসাম্য এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে যেখানে সরকার স্থিতিশীল থাকবে, একই সঙ্গে সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন।
তাই বলা যায়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সম্ভাব্য সংস্কার কেবল একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও পরিণত, অংশগ্রহণমূলক এবং কার্যকর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

