শাহজাহান আলী মনন, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি :
ঈদ মানেই নতুন জামা, আনন্দ আর হাসিতে ভরা একদিন। কিন্তু সমাজের অনেক শিশুর জন্য সেই আনন্দের দিনটিও কখনো কখনো হয়ে ওঠে কেবলই আক্ষেপের। নতুন জামা কেনার সামর্থ্য না থাকায় দূর থেকে অন্যদের আনন্দই শুধু দেখে তারা। তবে এমন অনেক শিশুর মুখে এবার ঈদের আগেই হাসি ফুটিয়েছে এক মানবিক উদ্যোগ।
নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট এলাকায় শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে দেখা গেলো এক ভিন্ন দৃশ্য। একটি স্কুলের পাশে সামিয়ানা টাঙিয়ে বানানো হয়েছে ছোট্ট একটি অস্থায়ী দোকান। দোকানের সামনে বড় একটি ব্যানারে লেখা ‘১ টাকায় ঈদের নতুন জামা’। ব্যানারটি দেখেই আশপাশের পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে কৌতূহল আর আনন্দ।
দোকানের সামনে তখন সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে শতাধিক শিশু-কিশোর। কেউ হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে একটি এক টাকার কয়েন, কেউবা কাগজের নোট। তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট উত্তেজনা, আজ তারা কিনবে ঈদের নতুন জামা, তাও আবার মাত্র এক টাকায়।
দোকানের ভেতরে ব্যস্ত সময় পার করছেন কয়েকজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী। আগত শিশুদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, তাদের পছন্দের পোশাক দেখাচ্ছেন, আবার সাইজ মিলিয়ে দিচ্ছেন। তারপর শিশুদের হাত থেকে ১ টাকা নিয়ে তুলে দিচ্ছেন নতুন ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট কিংবা প্যান্ট।
নতুন পোশাক হাতে পেয়ে শিশুদের মুখে তখন খুশির ঝিলিক। এভাবে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে ঈদের নতুন পোশাক পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে সৈয়দপুরের শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু। মূলত সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ঈদের আনন্দে শামিল করতেই এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর’।
সংগঠনটির সদস্যদের উদ্যোগে প্রতি বছরের মত এবারও গোলাহাট এলাকায় বসানো হয় ব্যতিক্রমী ১ টাকার দোকান’। এখানে নতুন ডিজাইনের ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্টসহ শিশুদের নানা ধরনের পোশাক সাজিয়ে রাখা হয়।
ওই এলাকার শিশু রেহান (১০) ও আকাশি (৮) জানায়, তাদের পরিবারে আর্থিক কষ্টের কারণে ঈদের সময় নতুন কাপড় কেনা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এখানে ১ টাকায় নতুন জামা দেওয়া হচ্ছে শুনেই তারা ছুটে আসে।
রেহান বলে, আমাদের বাসায় নতুন জামা কেনা হয় না সব সময়। এখানে ১ টাকায় নতুন জামা দিচ্ছে শুনে খুব ভালো লাগছে। আকাশি হাসিমুখে জানায়, আমি নিজের পছন্দের একটা ফ্রক নিয়েছি। খুব সুন্দর লাগছে। ঈদের দিন এটা পরবো।”
শুধু শিশুদের পোশাকই নয়, এই এক টাকার দোকানে রাখা হয়েছে অসহায় মানুষের জন্য শাড়ি, লুঙ্গি ও থ্রি-পিসও। দরিদ্র মানুষরাও মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে এসব পোশাক সংগ্রহ করতে পারছেন।
মাত্র এক টাকায় নতুন পোশাক হাতে পেয়ে মহাখুশি অসহায় শিশু সাবিনা (১২) ও কৌশিক (৮)। তাদের দু’জনেরই বাবা নেই। মা অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। এখনো তাদের জন্য নতুন জামা কিনে দিতে পারেননি তিনি।
সাবিনা জানায়, আমার মা বলছিলেন হয়তো এবার নতুন জামা হবে না। কিন্তু এখানে এসে ১ টাকায় নতুন জামা পেলাম। খুব ভালো লাগছে। কৌশিকও নতুন জামা হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, এবার ঈদে নতুন জামা পরে ঘুরতে পারবো।
সংগঠনের সদস্য মিথুন, সামিউল, রাজা, রাব্বি, রকি জানান, সমাজে অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশু রয়েছে যারা প্রায় সব উৎসবেই বঞ্চিত থাকে। ঈদের সময় নতুন জামা তাদের কাছে অনেক বড় স্বপ্নের মতো। তারা বলেন, ঈদ সবার জন্য আনন্দের দিন। কিন্তু অনেক শিশু নতুন কাপড় কিনতে পারে না। সেই শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটাতেই আমাদের এই ছোট উদ্যোগ।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাংবাদিক নওশাদ আনসারী বলেন, আমাদের এই আয়োজন মূলত এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য। যেসব শিশুদের ঈদের নতুন জামা হয়নি, তারা এখানে এসে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে নিজের পছন্দের পোশাক নিতে পারছে। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের অর্থায়নে এই আয়োজন করেছে।
তিনি আরও জানান, শুধু পোশাক নয়, পর্যায়ক্রমে অসহায় মানুষের মধ্যে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিসের পাশাপাশি সেমাই, চিনি ও দুধও বিতরণ করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম ঈদের চাঁদ রাত পর্যন্ত চলবে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছরই ঈদকে সামনে রেখে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নতুন জামা, সালামি এবং দরিদ্র মানুষের জন্য শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে ‘আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর’ সংগঠনটি।
শিশুরা সবসময়ই ঈদের দিনে নতুন জামা পরতে চায়। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুর সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। আর সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সৈয়দপুরের তরুণদের এই সংগঠন।
মাত্র এক টাকার বিনিময়ে নতুন জামা—এই ছোট উদ্যোগই হয়তো অনেক শিশুর ঈদের আনন্দকে করে তুলেছে রঙিন, উজ্জ্বল আর স্মরণীয়।


