ত্যাগের মহিমায় ড. নাগাসেন গড়েছেন অনাথ শিশুদের ভবিষ্যৎ

পাহাড়ের বুকে যেন এক টুকরো স্বর্গ

রিপন মারমা কাপ্তাই (রাঙ্গামাটি)
সুদূর লন্ডনে উচ্চশিক্ষা ও পিএইচডি শেষ করে যেখানে বিলাসিতার হাতছানি ছিল, সেখানে নাড়ির টানে দুর্গম পাহাড়ে ফিরে এসেছেন ড. নাগাসেন মহাথেরো। নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে রাঙ্গামাটি কাপ্তাই উপজেলার কুকিমারা এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন ‘লোটাস শিশু সদন’।
২০১১ সালে স্থানীয় সুইপ্রু কারবারি ও গংজ মারমার দান করা ৫ একর জমিতে রোপণ করা সেই শিক্ষার বীজ আজ কয়েকশ সুবিধাবঞ্চিত শিশুর স্বপ্ন জয়ের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি কেবল প্রথাগত শিক্ষা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে নৈতিকতা, দক্ষতা ও মানবতা। ড. নাগাসেন মহাথেরোর মতে, শুধু অন্ন-বস্ত্র নয়, গুণগত শিক্ষাই একজন অনাথ শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এখানে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অহিংসা চেতনা, যুক্তিবোধ এবং সৃজনশীল কর্মদক্ষতা অর্জনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে লোটাস শিশু সদনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৯৫ জন এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৯০ জনসহ মোট ৩৮৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধায় থেকে পড়াশোনা করছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ২০ জন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন। গত বছরই প্রতিষ্ঠানটি নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে বোর্ড থেকে পাঠদানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি পেয়েছে। সুশৃঙ্খল রুটিন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের কারণে এটি পাহাড়ের অনাথ ও পিছিয়ে পড়া শিশুদের মূলধারায় ফেরার প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে।
“আমাদের লক্ষ্য হলো এমন এক প্রজন্ম তৈরি করা যারা নিজের উন্নতির পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা যেন কেবল পুঁথিগত না হয়ে জীবনমুখী হয়, আমরা সেই চেষ্টাই করছি।”
বিশাল এই কর্মযজ্ঞ চললেও বর্তমানে নানা সীমাবদ্ধতায় হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ৫ একরের এই বিশাল ক্যাম্পাসে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক আবাসিক শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের খাবারের ব্যয় মেটাতে মূলত ব্যক্তিগত ও বেসরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনা দিন দিন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
প্রতিষ্ঠাতা ড. নাগাসেনের দর্শনে প্রকৃতি ও মানুষ অবিচ্ছেদ্য। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা জাগিয়ে তুলতে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি পাহাড়ের দরিদ্র পরিবারের জন্য এক আশীর্বাদ। যথাযথ সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে লোটাস শিশু সদন পাহাড়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Welcome Back!

Login to your account below

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Add New Playlist