দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরে এ বছর আলুর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে দামের ধসে চরম বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি আলুর দাম নেমে এসেছে মাত্র ১০ টাকায়। অর্থাৎ দুই কেজি আলু বিক্রি করলেই পাওয়া যায় মাত্র এক কাপ দুধ চায়ের দাম—২০ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষক জমি থেকে আলু তুলতেও সাহস পাচ্ছেন না।
দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখনো হাজার হাজার একর জমিতে আলুর গাছ শুকিয়ে পড়ে আছে। অনেক স্থানে কৃষকরা আলু উত্তোলন করে বস্তায় ভরে জমিতেই রেখে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ট্রাক্টরে করে কোল্ডস্টোরেজে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কোল্ডস্টোরেজে আলু রাখতে গেলেও বস্তাপ্রতি গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা, যা কৃষকদের জন্য নতুন করে চাপ তৈরি করছে।
জেলা শহরের কাছাকাছি মাজাডাঙ্গা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, নারী-পুরুষ মিলে কেউ কেউ আলু তুলছেন, আবার অনেক জমিতে আলু তুলতে দেরি করছেন কৃষকরা। কারণ একজন শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা দিতে হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা। অথচ বাজারে ৬৫ কেজি ওজনের এক বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ টাকায়। ফলে আলু উত্তোলনের খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।
মাজাডাঙ্গা গ্রামের কৃষক শরীয়তুল্লাহ বলেন, “এ বছর গরু-ছাগল বিক্রি করে এক একর জমিতে আলুর চাষ করেছি। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ফলনও ভালো হয়েছে—প্রায় ২৫০ বস্তা আলু হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম এত কম যে সব খরচ বাদ দিয়েও ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছি। আগামী বছর আলু চাষ করবো কি না, সেটা নতুন করে ভাবতে হবে।
দিনাজপুর চেহেলগাজী বনকালী সাহাপাড়া গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “গত বছরও এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করে প্রায় ২০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছিল। এবার ঋণ ও মহাজনের টাকা নিয়ে তিন বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি। নিজেরা আলু তুলছি, কিছু শ্রমিকও লাগিয়েছি। কিন্তু দাম না থাকায় পরিবারে অশান্তি বাড়ছে। গত বছরও ক্ষতি, এবারও ক্ষতি—এভাবে চললে সংসার চালানো কঠিন।
একই গ্রামের সুনীল নারায়ন জানান, তিনি ৪৮ শতক জমিতে আলু চাষ করেছেন। ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম নেই। অনেকেই জমি থেকেই ৬ থেকে ৭ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে চাইছেন। তিনি বলেন, “এই দামে আলু বিক্রি করলে আসল টাকাই উঠবে না। এনজিও থেকে কিস্তি নিয়ে আলু চাষ করেছি, এখন সেই টাকা পরিশোধ করতেও পারছি না।
শ্রমিক মনিকা রানী বলেন, “সকাল থেকে জমিতে আলু তোলার কাজ করি। প্রতিদিন ৫০০ টাকা হাজিরা পাই। কিন্তু কৃষকেরা এখন আমাদের মজুরি দিতেই কষ্ট পাচ্ছেন। বাজারে আলুর দাম না থাকায় কৃষকেরা বিপদে আছেন।
দিনাজপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তুষার জানান, এ বছর সদর উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। বর্তমানে বাজারে চাহিদা কম থাকায় দাম কমে গেছে। তিনি বলেন, “চাষিদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি যাতে কোল্ডস্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করতে পারেন এবং স্টোরেজ ভাড়া যেন ন্যায্যমূল্যে নির্ধারণ করা হয় সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আলু উত্তোলনের মৌসুম চলায় বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কম। তবে আগামী এপ্রিল-মে মাসের পর থেকে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে জুন-জুলাইয়ের দিকে আলুর দাম বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন কৃষকেরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে মনে করছেন।

