সাংহাই শহরের ভোর তখনও ঠিকমতো জাগেনি। রাস্তায় আলো জ্বলছে, মানুষজনের আনাগোনা শুরু হতে আরও সময় বাকি। কিন্তু ৩টার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন হুয়ান কং। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন দিনের প্রথম কাজের উদ্দেশে—একটি বাড়িতে থাকা একটি বিড়ালকে খাবার দিতে। এভাবেই শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের ব্যস্ত দিন।
হুয়ান কং, জন্ম ১৯৯১ সালে। চীনের ব্যস্ততম শহরগুলোর একটি সাংহাইয়ে থাকেন তিনি। পেশা—পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া। অনেকের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু এই কাজ করেই তিনি এ বছরের চীনা নববর্ষে আয় করেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ইউয়ান—বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ২৮ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি।
চীনের সবচেয়ে বড় উৎসব চীনা নববর্ষ। এ সময় পুরো দেশ যেন এক বিশাল ভ্রমণমুখর জনস্রোতে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত উৎসব চলেছে। দীর্ঘ ছুটিতে কেউ ঘুরতে বের হন, কেউ আবার বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে ফিরে যান। অনেকেই বলেন, এই সময়টাতেই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ একসঙ্গে ভ্রমণ করেন। কিন্তু সমস্যা হয় অন্য জায়গায়—পোষা প্রাণী নিয়ে।
অনেকেরই বাড়িতে থাকে বিড়াল বা অন্য পোষা প্রাণী। ভ্রমণের সময় তাদের সঙ্গে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। তাই এই সময় পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়ার পেশাদার সেবার চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান হুয়ান। প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি পেশাদারভাবে পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়ার কাজ করছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের একটি ছোট দলও গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তাঁর দলে মোট পাঁচজন সদস্য।
চীনা নববর্ষের সময় তারা সাংহাইয়ের বাসিন্দাদের কাছ থেকে বিশেষ অনুরোধ পায়। যারা ভ্রমণে যাচ্ছেন বা নিজ শহরে পরিবারের কাছে গেছেন, তারা বাড়িতে থাকা বিড়ালগুলোর খাবার দেওয়ার দায়িত্ব তুলে দেন হুয়ানদের হাতে। উৎসবের আগে ও পরে মিলিয়ে প্রায় ২০ দিনের বেশি সময় ধরে হুয়ানের দল প্রায় দুই হাজার বাড়িতে গিয়ে বিড়ালকে খাবার দিয়েছে। এর মধ্যে হুয়ান একাই গিয়েছেন প্রায় এক হাজার বাড়িতে। তাঁদের অনেক গ্রাহক আবার নিয়মিত। প্রায় প্রতি বছরই তারা হুয়ানের সেবা নেন।
উৎসবের সময় হুয়ানের দিন শুরু হয় ভোর তিনটায়। আর কাজ শেষ হয় রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে। এত ব্যস্ততার মধ্যে দিনে তিনি মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন। সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে তিনি প্রায় ৫৫টি বাড়িতে গিয়েছেন। প্রতিটি বাড়িতে তাঁর সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি কাজ করেন—বিড়ালের খাবার ও পানি বদলে দেন, লিটার বক্স পরিষ্কার করেন, বিড়ালের স্বাস্থ্যের অবস্থা দেখে নেন এবং সব ময়লা আবর্জনা সঙ্গে করে নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
তবে এখানেই শেষ নয়। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে তিনি বাড়তি সেবাও দেন। যেমন—বিড়ালকে ওষুধ খাওয়ানো, নখ কেটে দেওয়া বা বিশেষ যত্ন নেওয়া। এইভাবেই মাত্র দুই সপ্তাহে হুয়ান কং এবং তাঁর দল আয় করেছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ইউয়ান। এই গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই অবাক হয়ে দেখছেন—শুধু বিড়ালকে খাবার খাইয়েই কীভাবে এত আয় সম্ভব! কিন্তু হুয়ানের মতে, এর পেছনে রয়েছে বিশ্বাস আর দায়িত্ব।
কারণ যখন কেউ নিজের প্রিয় পোষা প্রাণীকে অন্যের হাতে রেখে যান, তখন সবচেয়ে বেশি দরকার হয় বিশ্বাসযোগ্য মানুষের। আর বড় উৎসবের সময় সেই বিশ্বাসযোগ্য সেবার চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। সাংহাইয়ের সেই ভোরের অন্ধকারে তাই প্রতিদিন আবারও বেরিয়ে পড়েন হুয়ান কং—আরেকটি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়তে, আরেকটি বিড়ালের খাবার দিতে।
কারণ তাঁর কাছে এটা শুধু কাজ নয়—এটা এক ধরনের দায়িত্ব।

