মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকার ব্যবসায়ী মহলে অস্বস্তি স্পষ্ট। চট্টগ্রাম বন্দরের এক বৈঠককক্ষে বসে শিপিং, জ্বালানি ও পোশাক খাতের নেতারা হিসাব কষছেন—যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের কী হবে?
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ নীরবতা ভেঙে বলেন, “বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ। তাই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা হলেই আমরা ঝুঁকিতে পড়ি।” তার আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পণ্য পরিবহন বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে। ইতোমধ্যে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমেছে। যদি রাশিয়া ও চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক শিপিং রুট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ আরও কাঠামোগত উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। তার ভাষায়, “এই যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপে পড়বে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন—মধ্যপ্রাচ্যই বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস, বিশেষ করে জ্বালানি। ফলে পেট্রোলিয়াম পণ্য ও এলএনজির দাম বাড়তে পারে, সরবরাহ অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন—এশিয়া ও ইউরোপ এবং আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর অন্যতম প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে অবস্থিত। যুদ্ধের প্রভাব সেখানে পড়লে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।
ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাংলাদেশ এখন মূলত আমদানিনির্ভর। “মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহ—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে,” বলেন তিনি। তার সতর্কবার্তা, “যুদ্ধ চলতে থাকলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ব।”
এদিকে পোশাক খাতও উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ গার্মেন্ট প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “আমরা একটি রপ্তানিনির্ভর দেশ। তাই এই যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করতেই হবে।” তার যুক্তি তিনটি—প্রথমত, যুদ্ধের কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমলে পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়বে। তৃতীয়ত, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে বিকল্প ও দীর্ঘ নৌপথ ব্যবহার করতে হলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে সামগ্রিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় অনেকেই ভেবেছিলেন তা দুই সপ্তাহে শেষ হবে। কিন্তু চার বছর পরও সেই যুদ্ধ চলছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত দীর্ঘ হলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি বাজারগুলোও বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের ইরানি বাজারে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে প্রায় ১০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য—যার বেশিরভাগই পোশাক ও ফার্মাসিউটিক্যালস। ঢাকার বৈঠককক্ষের আলোচনায় তাই স্পষ্ট—যুদ্ধের গোলা শুধু সীমান্তেই বিস্ফোরিত হয় না, তার অভিঘাত পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের অর্থনীতিতেও।

