সত্যজিৎ দাস, (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি):
মৌলভীবাজারে বোরো আবাদের মৌসুমে সেচ সংকটে কৃষকরা চরম সমস্যায় পড়েছেন। পানির অভাবে জেলার প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ সম্ভব হচ্ছে না। আর যারা আবাদ করেছেন,তারা ৬০ হাজারেরও বেশি কৃষক পর্যাপ্ত সেচের অভাবে ফসলের ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। কিছু কৃষক টাকা দিয়েও পানির ব্যবস্থা পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে জেলার সাতটি উপজেলার হাওর ও নন-হাওর এলাকাগুলিতে গিয়েও একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, কেওলার হাওরসহ কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, জুড়ী, বড়লেখা—সবখানেই সেচের জন্য কৃষকদের হাহাকার। অনেক ক্ষেত্রেই ধানের চারা রোপণের পরও জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, আর একর প্রতি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করেও ফসলের ক্ষতি হওয়া নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই মৌসুমে জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২,৪০০ হেক্টর। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭,৩৪৫ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৫,০৫৫ হেক্টর জমি চাষাবাদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু সেচের সমস্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সেচের ব্যবস্থা যথাযথ থাকলে আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমি আবাদ করা সম্ভব হত।
সেচ ব্যবস্থার দুর্বলতা বেশ প্রকট,কারণ নতুন নালা খনন করা হয়নি এবং অনেক পুরনো নালা ভরাট হয়ে গিয়ে উঁচু হয়ে গেছে। এমনকি কয়েকটি স্থানে স্লুইসগেট ও ক্রসবাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা হচ্ছে, যার ফলে উজানের কৃষকেরা পানির সুবিধা পাচ্ছেন না। কাউয়াদিঘী হাওরে নির্মিত ১০৫ কিলোমিটার সেচ নালার বেশিরভাগ অংশ এখন অকার্যকর। কুদালী ছড়ায় প্রায় ২,৫০০ হেক্টর জমি সেচ সংকটে পড়েছে। রাজনগর ও সদর উপজেলায় ১০,০০০ কৃষক পানির অভাবে উদ্বিগ্ন।
কমলগঞ্জের কিছু ইউনিয়নে লাঘাটা নদীতে পানি কম আসায় সেচ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। কুলাউড়ার হাজীপুর,শরীফপুর, পৃথিমপাশাসহ অন্যান্য এলাকায়ও একই অবস্থা। হাকালুকি হাওরের উঁচু অংশে পাইপের মাধ্যমে পানি টেনে আনা হচ্ছে,যার ফলে খরচ বাড়ছে এবং ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
কুলাউড়ার কৃষক সালাম মিয়া বলেন,”মৌসুমের শুরুর দিকে কিছু পানি পাওয়া যায়, তবে পরে আর কিছুই থাকে না। অনেক টাকা খরচ করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরতে হয়।” কমলগঞ্জের কৃষক আমীন আলী জানান, “ফসল বাঁচাতে অনেক দূর থেকে পানি আনা হয়,তবে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে পানি একেবারে শেষ হয়ে যায়।”
এদিকে,জেলার কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ১৪টি সৌরচালিত সেচব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে, কর্মকর্তারা মনে করছেন,এই সংখ্যা বাড়ানো গেলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,যদি কুদালী ছড়ার নালা খনন করা যায়,তবে কয়েক হাজার হেক্টর জমি আবাদে আনা সম্ভব হবে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, “যেসব স্থানে সেচ নালা রয়েছে,সেখানে কৃষকরা কিছুটা পানি পাচ্ছেন। তবে যেখানে সমস্যা দেখা দিয়েছে,সেখানে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন জানান,”জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট রয়েছে। সঠিক সেচ ব্যবস্থা না থাকলে আবাদে সমস্যা হতে পারে। নলকূপের অভাব এবং নালা খনন না হওয়ায় কৃষকেরা সমস্যায় পড়ছেন। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সমস্যাগুলি জানিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছি।”

