বাংলাদেশের পপ গানের জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম—আজম খান। তিনি একাধারে পপ গানকে দেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছেন নতুন ধারার এই গান। তরুণদের জন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল সৃজনশীলতা আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সমাজ গড়া।
আজম খানের শৈশব কেটেছে আজিমপুর ও কমলাপুরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রভাব অনুভব করতেন। জানালার বাইরে মাতৃভাষার জন্য মানুষ যে গণজমায়েত করেছে, তা তিনি চোখে দেখেছেন এবং মনে রেখেছেন। স্কুলে পড়ার সময় তিনি গান শোনতেন এবং হুবহু গাইতে পারতেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, আবদুল আলিম, শ্যামলের গান—সবকিছুর অনুকরণ করতেন তিনি।
নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন তিনি পাকিস্তানি শাসনের অন্যায় বুঝতে শুরু করেন। বন্ধুদের সঙ্গে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গণসংগীত চর্চা শুরু করেন। গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, এবং পুলিশের লাঠি-ঠেসও খেয়েছেন সেই সময়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি দেশপ্রেমিক গান করে সাহস জোগান মুক্তিযোদ্ধাদের। একদিন মাকে জানিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে রওনা হন, দেশের মুক্তির জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আজম খান দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দে গানের জগতে পা রাখেন। তিনি বিটলস, রোলিং স্টোন, দ্য শ্যাডোজের গান শুনে নিজস্ব পপ ধারার সৃষ্টি করেন। বন্ধুদের সঙ্গে অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু করেন, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে পুরো দেশে ভক্ত তৈরি হয়।
আজম খানের গান ছিল সাধারণ মানুষের কষ্ট, দেশপ্রেম ও সচেতনতা নিয়ে। ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘এত সুন্দর দুনিয়ায়’, ‘অভিমানী’, ‘পাপড়ি’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘আমি যারে চাইরে’, ‘জ্বালা জ্বালা’—এই সব গান প্রমাণ করে, তিনি কেবল শিল্পী নন, বরং তরুণদের অনুপ্রেরণার প্রতীক।
১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা আজম খান ২০১১ সালের ৫ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর গান আজও সমসাময়িক, দেশের মাটিতে তরুণদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। তাঁর সৃষ্টিই তাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে।

