নাজমুল হোসেন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নূরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দূর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও সাংবাদিকদের উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
শুধু তাই নয় স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যকে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে পুঁতে ফেলার’ হুমকিও দিয়েছেন এই কর্মকর্তা। তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার বিকারগ্রস্থ কর্মকর্তা হিসেবে উপাধি দিয়েছেন তাকে। তবে তার এই ইতিহাস নতুন কোন ঘটনা নয়, তার কর্মজীবনের ইতিহাসেরই অংশ।
সোমবার দুুপুরে রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদের সামনে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নূরুন্নবী সরকার কর্তৃক ইউপি সদস্য আক্কাশ আলীকে প্রাণ নাশের হুমকি ও লাঞ্চিত করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে রাণীশংকৈল উপজেলার সকল ইউপি সদস্যদের ব্যানারে। এ সময় বক্তারা দূর্নীতিবাজ পিআইও-র অপসারণসহ শাস্তির দাবী জানান তারা।
জানা গেছে, নূরুন্নবী সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে আসছেন। যা সরকারি চাকুরী বিধিমালার শৃঙ্খলা ভঙ্গের লঙ্ঘন। তার এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হতেও দেখা গেছে।
চলতি বছরের ৫ ফেব্রæয়ারী শীতবস্ত্র নিয়ে অনিয়ম, খারাপ আচরণ, প্রকাশ্যে অফিস কক্ষ্যে ধুমপান ও দূর্নীতির বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মানববন্ধনের আয়োজন করে। সেই মানববন্ধনের সংবাদ প্রকাশ এবং ২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্রয়কৃত সিসি ক্যামেরার ব্যায় জানতে চাওয়ার জেরে স্থানীয় চার সাংবাদিকের উপর চাঁদাবাজীর মামলা দেন নূরুন্নবী সরকার। এখানেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি।
রাণীশংকৈলে কর্মস্থলে যোগদানের পরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় বেশ কয়েকদিন রাত্রী যাপন করেন। সেই রাত্রী যাপনের ভাড়ার টাকা চাইতে গিয়ে মামলার আসামী হন কেয়ারটেকার বেলাল উদ্দীন। পিআইও-র কাছে গেলাম না, অথচ আমাকে মামলার আসামী করেছে। উপজেলা চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলেই জানা যাবে ওনার কাছে গিয়েছি কি না ? কথা গুলো বলছিলেন সাংবাদিক আব্দুল জব্বার।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা যেখানেই কর্মরত ছিলেন সেখানেই তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশও হয়েছে বেশ কয়েকবার। ২০২০ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং লঘু দÐ হিসেবে নুরুন্নবী সরকারের বেতন কমানো হয়। আরও জানা গেছে, ২০১৫ সালে সুন্দরগঞ্জে যোগদানের পর থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটসহ নানা বিতর্কীত কর্মকাÐে আলোচনায় আসেন পিআইও নুরুন্নবী সরকার। একাধিক হামলা-মামলার শিকার, দুর্নীতি ও চাঁদাদাবির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দুদকসহ পাঁচটি মামলা হয়েছিল।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের জুন ক্লোজিংয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকার বিলে স্বাক্ষর করে নেন পিআইও নুরুন্নবী। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে দেশজুড়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় পিআইও নুরুন্নবী সরকারের দুর্নীতি কর্মকাÐ নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। পরে অধিদফতর তাকে সন্দ্বীপে বদলি করে। কিন্তু সুন্দরগঞ্জ ছাড়তে নারাজ ছিলেন নুরুন্নবী, শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের শরনাপন্ন হয়েও ব্যর্থ হন। সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর যমুনা টেলিভিশন ও কালের কণ্ঠের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ১২ গণমাধ্যম ও মানবাধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে আমলি আদালত (কোতোয়ালী) রংপুরে পৃথক দুটি মানহানির মামলা করেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আক্কাশ আলী জানান, বরাদ্দের কাজ চলমান ছিল, পিআইও এসে আমার কাছে উৎকোচ দাবী করে। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে সাড়ে তিনহাত পাটির নীচে পুঁতে ফেলার হুমকি দেয় এবং মেম্বারী খেয়ে ফেলার হুমকি দেয়। আমি দূর্নীতিবাজ পিআইওর শাস্তি দাবী করছি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নূরুন্নবী সরকারের একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।
রাণীশংকৈল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমানুল্লাহ আল-বারী পিআইওর দায়ের করা অভিযোগ এফআইআর ভ‚ক্ত করলেও স্থানীয় ইউপি সদস্যের দায়ের করা অভিযোগ এফআইআর ভ‚ক্ত করেননি। ওসি জানান পিআইও চাঁদাবাজী এবং মানহানির অভিযোগ দিলে বিষয়টি আমলে নিয়ে এফআইআর ভ‚ক্ত করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তদন্ত চলছে।
রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম বলেন অভিযোগ পেলে আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষসহ তার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে । ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইরশাত ফারজানা জানান, সরকারি কর্মচারীদের চাকুরী বিধিমালা অনুযায়ী চলতে হয়। যদি তিনি সরকারি বিধি ভঙ্গ করে কিছু করে থাকলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হবে।

