শাহজাহান আলী মনন, জেলা প্রতিনিধি:
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় দীর্ঘদিন থেকে অচল হয়ে পড়ে আছে শতাধিক রেলকোচ (বগি)। শুধুমাত্র চাকার অভাবে এই কোচগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছেনা।
এগুলোর অধিকাংশই ব্রডগেজ লাইনের ঢাকামুখী বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের বগি। এছাড়াও বিভিন্ন ছোট ছোট যন্ত্রাংশের যোগান না থাকায় আরও প্রায় শতাধিক কোচ সংষ্কার করা যাচ্ছেনা। এগুলোও একই অবস্থায় পড়ে আছে। এর ফলে আসন্ন ঈদযাত্রায় ট্রেন সেবা বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে ঈদে ঘরমুখী মানুষের স্বাচ্ছন্দ যাত্রায় ব্যাঘাত ঘটবে। একারণে সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম ভোগান্তি হতে পাড়ে বলে জানা গেছে।
সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন সময় ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর একাধিক কোচে সমস্যা দেখা দেয়ায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নিয়ে আসা হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক কোচ। এগুলোর মধ্যে ১০০ টিরও অধিক কোচের শুধুমাত্র চাকার সমস্যা। এগুলোর চাকা পরিবর্তন করলেই আবার সচল হবে। কিন্তু সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় নতুন চাকার সরবরাহ নেই বেশ কয়েক বছর থেকে। আর মজুদ চাকাও শেষ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। যে কারণে এই কোচগুলো মেরামত করা সম্ভব হচ্ছেনা। একইভাবে আরও প্রায় ১০০ টি কোচ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কারণে অচল হয়ে আছে। এই কোচগুলো সচল করতে প্রয়োজনীয় কিছু ছোট ছোট যন্ত্রাংশও মজুদ নেই কারখানায়। যে কারণে সামান্য সমস্যা নিয়েই পুরো অচল হয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ কোচ। এতে ট্রেন সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কোচের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রড গেজ কোচগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

রেলওয়ে কারখানা সূত্রে জানা যায়, স্প্রিং, বিয়ারিং, পিক আয়রণ, হার্ডক্লকসহ বিভিন্ন ছোট ছোট যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানী করা হয়। যে কারণে সহসাই এই যন্ত্রাংশগুলো পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। বিগত এক বছর যাবত এই যন্ত্রাংশগুলোর আমদানী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ব্যাপক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আর এই যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনার পদ্ধতি বেশ জটিল ও সময় সাপেক্ষ হওয়ায় সহসাই এই সংকট দুর করা সম্ভব হচ্ছেনা। এমতাবস্থায় সব মিলিয়ে প্রায় দুই শতাধিক কোচ শুধুমাত্র যন্ত্রাংশের অভাবে মেরামত করা সম্ভব হচ্ছেনা। এর ফলে আগামী ঈদে এতগুলো কোচ ছাড়াই ট্রেন সেবা দিতে হবে রেলওয়েকে। এক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়বে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
একটি সূত্র মতে, অচল হয়ে পড়ে থাকা কোচগুলোর বেশিরভাগই বিদেশ তথা ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন থেকে আমদানীকৃত। এগুলো আনার পর একই সাথে বিভিন্ন ট্রেনে সংযোজিত করে চালানো হয়েছে। এরফলে এগুলোর বিভিন্ন সমস্যা একই সময়ে দেখা দিয়েছে। আর এর মধ্যেই ট্রেন আমদানী সংক্রান্ত চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে। একারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর পক্ষ থেকে কোন সার্ভিস পাওয়া যাচ্ছেনা। আর তাই এর যন্ত্রাংশগুলো আলাদাভাবে আমদানী করে মেরামত করতে হচ্ছে। কিন্তু আমদানী কার্যক্রম জটিল হওয়ায় তা সহজেই কার্যকর করা যাচ্ছেনা। ন্যুনতম আরও এক বছর লাগবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশগুলো বিদেশ থেকে আনতে। আর এই সময় পর্যন্ত কোচগুলো মেরামত করা যাবেনা কোন ভাবেই।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সূফী নুর মোহাম্মদ বলেন, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্বেও শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংকটের কারণে যথা সময়ে মেরামত করা যাচ্ছেনা অধিকাংশ রেলকোচ। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আমদানী নির্ভর যন্ত্রাংশের খুবই সংকট দেখা দিয়েছে। একারণে আমাদের চাহিদা মাফিক আউটটার্ন দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছে। মুলতঃ যন্ত্রাংশ ক্রয় ও আমদানী পদ্ধতি সহজ না হওয়ায় এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অগ্রীম উদ্যোগ না নেওয়ায় এই পরিস্তিতিতে পড়েছে কারখানার মেরামত কার্যক্রম।
তিনি আরও বলেন, লোকবল সংকট সত্বেও প্রতি দুই দিনে ৩টি যাত্রীবাহী ও ৩ টি মালবাহী কোচ মেরামতে সক্ষম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মত না পাওয়ায় এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সময়মত ও আশানুরুপ সার্ভিস দেয়া যাচ্ছেনা। এতে রেলওয়ে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ছে। তাই আমদানী নির্ভর যন্ত্রাংশের আগাম মজুদ নিশ্চিত করাসহ সব ধরণের কাঁচামাল সরবরাহ সহজলোভ্য করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এজন্য রেলওয়ে ভবনসহ মন্ত্রণালয় ও সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ আশা করেন তিনি। একইসাথে জানান, স্থানীয়ভাবে সংগৃহিত যন্ত্রাংশ দিয়ে যেসব কাজ করতে হয় তা যথাসময়েই সম্পন্ন করছে কারখানার কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

এ ব্যাপারে নীলফামারী-৪ আসনের নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। এটিকে সচল ও কার্যকর রাখার জন্য আমাদের সকলেরই সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত। চলমান যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে এই কারখানার নিয়মিত মেরামত কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটা খুবই দুঃখজনক। আমি এই সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সকল দপ্তরে যোগাযোগ করবো এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সার্বিক প্রচেষ্টা চালাবো। বিশেষ করে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এবিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। যাতে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হয়। এতে কারখানার উন্নয়নসহ ট্রেন যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


