বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্যসচিব মাহদী হাসানকে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে তার অবস্থান এবং সেখান থেকে নাটকীয়ভাবে দেশে ফেরা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য। অবশেষে দিল্লির সেই ঘটনাক্রম নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
যেভাবে শনাক্ত হলেন মাহদী হাসান
গত বুধবার বিকেলে ভারত থেকে দেশে ফেরেন মাহদী হাসান। জানা গেছে, তিনি পর্তুগালের ভিসার আবেদন জমা দিতে দিল্লি গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকালে দিল্লির কনট প্লেসে একটি বেসরকারি ভিসা সেন্টারে তাকে প্রথম দেখা যায়। সেখানে অন্য এক ভিসা প্রার্থী তাকে চিনে ফেলেন এবং ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই মাহদী হাসানের ফোনে অজ্ঞাত নম্বর থেকে একের পর এক কল আসতে শুরু করে, যা তাকে আতঙ্কিত করে তোলে।
‘ভারতবিরোধী বক্তব্য ও হিন্দু কর্মকর্তা হত্যা’র অভিযোগ
বিবিসি বাংলার সঙ্গে আলাপকালে ভারতীয় দুটি সূত্র জানিয়েছে, মাহদী হাসানকে কোনো শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি। তবে তাকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। সূত্রমতে, ভারতের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—“ভারতবিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের একজন হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে কোনো ব্যক্তিকে ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না।”
উল্লেখ্য, এর আগে একটি ভাইরাল ভিডিওতে মাহদী হাসানকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির সামনে বলতে শোনা যায় যে, তারা থানা পুড়িয়েছেন এবং এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এই ভিডিওর কারণেই তিনি ভারতীয় কর্মকর্তাদের নজরে আসেন।
রাতভর নজরদারি ও ভিসা বাতিল
সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই মাহদী হাসানের ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়। রাতেই তার ভারতীয় ভিসা বাতিল করা হয়। তিনি পাহাড়গঞ্জের হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছের একটি হোটেলে আশ্রয় নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। পরদিন বুধবার সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে সিকিউরিটি চেকের সময় তাকে লাইন থেকে সরিয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় জেরা করেন বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা। প্রায় আধঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
৪১ লাখ টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি বিতর্ক
অভিযোগ উঠেছে, মাহদী হাসান দিল্লি থেকে সরাসরি লিসবনে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং তার কাছে প্রায় ৪০ লাখ টাকার বেশি সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি ছিল। তবে বাংলাদেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহদী হাসান একে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
দেশে ফিরে যা বললেন মাহদী
বুধবার বিকেলে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে মাহদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “আমাকে বৈষম্যবিরোধী নেতা হিসেবে শনাক্ত করে প্রচণ্ড হ্যারাস (হয়রানি) করা হয়েছে। আমি লাইফ রিস্কে ছিলাম। অন্য দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, ভারত তা দেয়নি।”
দেশে ফেরার পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে তিনি জানান। তবে দিল্লিতে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টার সঠিক বিবরণ বা ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবির বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

