মোঃ হারুন উর রশিদ, স্টাফ রিপোর্টার:
স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাটির উর্বরতা হ্রাস ও পরিবেশগত ক্ষতির কথা বারবার উচ্চারিত হলেও উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর জেলা নীলফামারীতে তামাক চাষ যেন কোন ভাবেই থামছে না। ধান, আলু, ভুট্টাসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির দরপতনের কারণেই মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর জেনেও লাভজনক বিকল্প ফসল হিসেবে তামাককেই বেছে নিয়েছেন কৃষকেরা। তাই প্রতি মৌসুমেই তামাকের আবাদ ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সচেতনতামূলক উদ্যোগ যেন কোন কাজেই আসছে না ।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ধান ও সবজির পাশাপাশি বিস্তীর্ণ জমিতে তামাকের সবুজ চাদর। লাভের আশায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে কাজ করছেন তামাক ক্ষেতে।
সদরের চান্দেরহাট, জলঢাকা উপজেলার বেরুবন, খেড়কাটি, হরিশ্চন্দ্র পাঠ, টেংগনমারী এলাকা ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা হলে তারা জানান “খরচ বেশি হলেও কোম্পানি সব কিনে নেয়। বাজারে দামের অনিশ্চয়তা নেই। এছাড়াও তামাক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থাকায় চাষের আগাম অর্থ, বীজ, সার ও কীটনাশক পাওয়া যায়, যা কৃষকের ঝুঁকি কমায়।তাই ক্ষতির কথা জেনেও তামাক চাষ করছি।”
সদরের পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নটখানা এলাকার তামাক চাষি বেল্লাল হোসেন জানান, এবছর আমি ৫ বিঘা জমিতে দেশি ও বিলাতি জাতের তামাকের চাষ করেছি। এই ৫ বিঘা জমিতে তামাক চাষ করে আমি আশা করছি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করবো। তবে অন্যান্য ফসলে সরকারীভাবে প্রণোদনা পেলে এমন বিষাক্ত তামাক চাষ থেকে বিরত থাকবো।
কৃষি বিভাগের মতে, জেলায় বিভিন্ন জাতের তামাক চাষ হচ্ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য বিরচিনিয়া, সুমাত্রা, জার্টকা, বার্লি, মধুরা ও দেশী জাতের তামাক। এবারে জেলায় প্রায় ১হাজার ২শত হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। তামাক চাষে যেমন মাটির পুষ্টি দ্রুত কমে যায় তেমনি এর গাছ উচ্চমাত্রায় নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ শোষণ করে, ফলে পরবর্তী মৌসুমে জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে মাটি ও পানি দূষণের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সমস্যার মূল কারণ অর্থনীতি। তামাক কোম্পানির সহজ ঋণ, নিশ্চিত ক্রয় ও তাৎক্ষণিক নগদ প্রবাহ কৃষকদের আকৃষ্ট করছে। বিকল্প ফসলে সমপরিমাণ লাভ ও বাজার নিশ্চয়তা না থাকায় তামাক থেকে সরে আসতে পারছেন না অনেকেই। তাই শুধু সচেতনতা নয়, বিকল্প ফসলের জন্য প্রণোদনা, সহজ ঋণ, বাজার সংযোগ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তামাক কোম্পানির চুক্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা জরুরি। তবেই দীর্ঘমেয়াদে কৃষকদের তামাক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, তামাক পাতার পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কৃষক ও শ্রমিকরা নানা স্বাস্থ্যসমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে সংক্রামক রোগে যা তামাক ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহারের ফলে হয়ে থাকে। এছাড়াও চর্ম, শ্বাসতন্ত্র, মাথাব্যাথা জনিত সমস্যাও দেখা দেয়।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মনজুর রহমান জানান, “আমরা বারবার তামাকের ক্ষতির কথা বলছি এবং ভুট্টা, গম, আলু, সবজি চাষে উৎসাহ দিচ্ছি। কিন্তু কৃষকরা নিশ্চিত আয়ের কারণে তামাক বেছে নিচ্ছেন।”

