রমজানের প্রথম সকাল। রাজধানীর বাজারগুলোতে তখন অন্য রকম এক ব্যস্ততা। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার আর কারওয়ান বাজার—সবখানেই ক্রেতাদের ভিড়, হাঁকডাক, দরদাম আর দীর্ঘশ্বাসের মিশ্র শব্দ।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় লেবু। মোটামুটি মানের একটি লেবুর দাম কমপক্ষে ২০ টাকা। আর আকারে বড়, ভালো মানের একটি লেবু কিনতে গেলে গুনতে হচ্ছে ৪০ টাকা। মানে এক হালি ডিমের দামের সমান! ৪০ টাকায় যেখানে এক হালি ডিম পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে একটি লেবুই সেই জায়গা দখল করে বসেছে। অনেকেই বলছেন—লেবু যেন ফলে নয়, বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।
বেলা ১১টা থেকে ১টার মধ্যে বাজার ঘুরে দেখা গেল, কৃষি মার্কেটে বড় আকারের লেবু হালি ১০০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম শুনে অনেক ক্রেতাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ ছোট আকারের লেবু কিনছেন ৮০ টাকা হালি দরে। আবার কেউ এক–দুটি লেবু কিনেই বাড়ি ফিরছেন।
সবজি বিক্রেতা আব্বাস আকন্দ বললেন, “কারওয়ান বাজার থেকে প্রতিটি লেবু পাইকারিতে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা দিয়ে কিনেছি। এখন হালি ১৪০ টাকা বিক্রি করছি। সন্ধ্যার দিকে কমে যায়, তাই এখন একটু বেশি রাখছি।”
রমজানের প্রথম দিন বলেই বাজারে ভিড় বেশি। স্বাভাবিক দিনের চেয়ে কেনাকাটা বেড়েছে। গতকাল যে দামে বেগুন, শসা, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা মরিচ ও খেজুর বিক্রি হচ্ছিল, আজ তা কমেনি—কিছু বাজারে বরং আরও বেড়েছে।
শসা কিনতে হচ্ছে কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। কোথাও কোথাও ২০০ টাকাও চাওয়া হচ্ছে। বেগুনের দামও ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। টাউন হল বাজারে পাশাপাশি দুই দোকানে শসা ও লেবুর হালি ২০০ টাকা করে চাওয়া হচ্ছিল। বিক্রেতাদের যুক্তি—পাইকারিতে বেশি দাম, সঙ্গে পরিবহন খরচ, দোকানভাড়া আর লাভ।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শামসুল হক হতাশ কণ্ঠে বললেন, “রোজা এলে বাজারে দাম বাড়ে—এটা নতুন কিছু না। দুই সপ্তাহ আগে শসা ৮০ টাকা কেজি কিনেছি। এক ডজন লেবু নিয়েছিলাম ১২০ টাকায়। আর এখন এক হালি লেবুই ১২০ টাকা!”
অন্যদিকে টমেটো ও গাজরের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। কাঁচা মরিচের দামও চড়া। পেঁয়াজ দুই সপ্তাহে কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে ৫৫-৬০ টাকায় উঠেছে।
তবে কিছুটা স্বস্তি ব্রয়লার মুরগিতে। সপ্তাহ দুই আগে ১৬০-১৭০ টাকা কেজি থাকা মুরগি গতকাল ২০০-২২০ টাকায় উঠেছিল। আজ তা ১০-২০ টাকা কমে ১৯০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যদিও সোনালি মুরগির দাম অপরিবর্তিত—৩২০-৩৫০ টাকা কেজি।
টাউন হল বাজারের ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ বললেন, “রোজার শুরুতে মানুষ একটু বেশি কেনেন। চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে। কয়েক দিন পর চাহিদা কমলে দামও কমে যাবে।”
বাজারের এই চিত্র যেন প্রতিবছরের চেনা গল্প। রোজা এলেই কিছু পণ্যের দাম বাড়ে, ক্রেতারা অভিযোগ করেন, বিক্রেতারা ব্যাখ্যা দেন। আর লেবু—যে ফল একসময় ছিল সাধারণের, আজ সে দাঁড়িয়ে গেছে ডিমের সমান দামে। রমজানের ইফতারে টক স্বাদের সেই ছোট ফলটি যেন এবারে একটু বেশি তেতো হয়ে উঠেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য।

