১৯৯৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। শীতের এক সাধারণ বুধবার। উত্তর ইউরোপের আকাশে তখন মেরূপ্রভা—অরোরা বোরিয়ালিস—নিয়ে গবেষণার প্রস্তুতি চলছে। নরওয়ের উপকূলের একটি বেসামরিক উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে বিজ্ঞানীরা একটি গবেষণা রকেট আকাশে পাঠান। উদ্দেশ্য একটাই—উত্তর মেরুর আকাশে যে রহস্যময় আলোর ঝলকানি দেখা যায়, তার প্রকৃতি বোঝা। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ পৃথিবীকে ঠেলে দেয় শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের কিনারায়।
ভুল সংকেত
রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের রাডার স্টেশনগুলো হঠাৎ একটি দ্রুতগামী বস্তুর সংকেত পায়। নরওয়ের সাগরপাড় থেকে একটি রকেট উৎক্ষেপিত হয়েছে এবং সেটি দ্রুত উচ্চতায় উঠছে। সামরিক প্রযুক্তিবিদদের মনে প্রশ্ন—এটি কি একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র?
তাদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না। ওই জলসীমা থেকে যদি কোনো মার্কিন সাবমেরিন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তবে তা মাত্র ১৫ মিনিটে মস্কোতে পৌঁছাতে পারে। রাডার চিত্রে যে গতিপথ দেখা যাচ্ছিল, তা এমনই এক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
খবর দ্রুত পৌঁছে যায় রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন-এর কাছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনি সক্রিয় করেন তাঁর ‘নিউক্লিয়ার ব্রিফকেস’—যে কেসের মাধ্যমে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।
মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের জন্য পৃথিবী দাঁড়িয়ে ছিল এক অনিশ্চিত প্রান্তে।
শীতল যুদ্ধের ছায়া
বার্লিন প্রাচীর ভেঙে পড়ার পর অনেকে ভেবেছিলেন পারমাণবিক উত্তেজনার যুগ শেষ। কিন্তু পারমাণবিক নীতির ভিত্তি ছিল ‘ডিটারেন্স’—যা ‘মিউচুয়ালি অ্যাশিউর্ড ডেস্ট্রাকশন’-এর ধারণায় দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ একপক্ষ আঘাত করলে, উভয় পক্ষই নিশ্চিত ধ্বংসের পথে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে ইয়েলৎসিন ও তাঁর উপদেষ্টাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো—পাল্টা আঘাত করা হবে, না কি অপেক্ষা করা হবে?
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তখন গুজব ছড়াতে শুরু করেছে। মস্কোভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানায়, রাশিয়া নাকি একটি ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। লন্ডনে বিবিসির নিউজ নাইট অনুষ্ঠানে উপস্থাপক জেরেমি প্যাক্সম্যান ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “শেষ করার আগে জানিয়ে দিই—আজ পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়নি।”
পেন্টাগনও বিভ্রান্ত। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা।
অবশেষে গ্রিনিচ সময় দুপুর ২টা ৫২ মিনিটে পরিস্থিতি পরিষ্কার হয়। রকেটটি রাশিয়ার দিকে ধেয়ে যায়নি; সেটি নরওয়ের আকাশেই উঠেছিল এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আর্কটিক অঞ্চলের স্পিটজবার্গেনের কাছে সাগরে পড়েছে।
একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা
এই উৎক্ষেপণ ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ—অরোরা গবেষণার অংশ। নরওয়ে আগেই কূটনৈতিকভাবে রাশিয়াকে বিষয়টি জানিয়েছিল। কিন্তু সেই বার্তা কোনোভাবে সঠিক দপ্তরে পৌঁছায়নি।
নরওয়ের বিজ্ঞানী কোলবিয়র্ন অ্যাডলফসেন পরে জানান, এটি ছিল প্রথম অরোরা গবেষণা রকেট যা এত উঁচু—প্রায় ৯০৮ মাইল—উচ্চতায় উঠেছিল। ব্যালিস্টিক গতিপথটি রাশিয়ার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে।
একটি বার্তা ঠিকমতো পৌঁছায়নি—এবং পৃথিবী প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল এক অনিবার্য বিপর্যয়ের কিনারায়।
প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক
এই ঘটনাকে কেউ কেউ পারমাণবিক যুগের “সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত” বলেছেন। আবার জাতিসংঘের গবেষক পাভেল পোডভিগের মতে, শীতল যুদ্ধের সময় এর চেয়েও গুরুতর অনেক ঘটনা ঘটেছে।
১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট ছিল এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। এছাড়া ভুল রাডার সংকেত, কম্পিউটার ত্রুটি, এমনকি পরিযায়ী পাখির ঝাঁকও অতীতে ‘ফলস অ্যালার্ম’ তৈরি করেছে।
১৯৮৭ সালে পশ্চিম জার্মান কিশোর ম্যাথিয়াস রুস্ট একটি ছোট বিমান নিয়ে সোভিয়েত প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে ক্রেমলিনের কাছে অবতরণ করেন—যা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। সেই স্মৃতিও হয়তো রুশ কর্মকর্তাদের সতর্কতাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ঘটনার পাঁচ দিন পর রাশিয়া একে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে উল্লেখ করে। নরওয়ের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ নেই বলেও জানায়। তবু এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পারমাণবিক যুগে কখনো কখনো একটি সাধারণ বৈজ্ঞানিক রকেটও বিশ্বকে ঠেলে দিতে পারে সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে। একটি বার্তা, একটি রাডার সংকেত, কয়েক মিনিটের অনিশ্চয়তা—এতেই ইতিহাস অন্যদিকে মোড় নিতে পারত।
সেদিন সন্ধ্যায় বিশ্ব বেঁচে গিয়েছিল।
কিন্তু আকাশে জ্বলজ্বলে অরোরার মতোই, সেই আতঙ্কের স্মৃতি এখনো ঝলসে ওঠে—নিঃশব্দে, সতর্কবার্তার মতো।

